অনেক মানচিত্রে সমুদ্রের বর্তমান উচ্চতাকে প্রকৃত উচ্চতার চেয়ে কম দেখানো হয়েছে
অনেক মানচিত্রে সমুদ্রের বর্তমান উচ্চতাকে প্রকৃত উচ্চতার চেয়ে কম দেখানো হয়েছে

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নিয়ে শত শত গবেষণায় ভুল

বিশ্বের উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকির মানচিত্র সাধারণত একটি সহজ ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। সেটি হলো সমুদ্রের উচ্চতা শূন্য থেকে শুরু। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রাথমিক ধারণাই ভুল হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা সমুদ্র উপকূলীয় ঝুঁকির ওপর করা শত শত গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, অনেক মানচিত্রে সমুদ্রের বর্তমান উচ্চতাকে প্রকৃত উচ্চতার চেয়ে কম দেখানো হয়েছে। এই গোপন ভুল গণনার অর্থ হলো যা ভাবা হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি জমি এবং লাখ লাখ মানুষ বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার অনেক কাছাকাছি বসবাস করছেন।

ইতালির পাদোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ৩৮৫টি প্রকাশিত উপকূলীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন পরীক্ষা করেছেন। তাঁরা দেখেছেন, অধিকাংশ মানচিত্র স্থানীয়ভাবে পরিমাপ করা জলতলের পরিবর্তে একটি আনুমানিক বৈশ্বিক রেফারেন্সের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, উপকূলীয় জলস্তর ওই আনুমানিক ভিত্তির চেয়ে অনেক বেশি উঁচুতে অবস্থান করছে।

এই প্রারম্ভিক ভুল বিজ্ঞানীদের আগের হিসাবকে বদলে দিচ্ছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সমুদ্রের উচ্চতা বাড়লে কোন কোন এলাকা ও জনগোষ্ঠী আগে ঝুঁকির মুখে পড়বে, সেই হিসাব নতুন করে করতে হবে। ইউরোপ ও আটলান্টিক উপকূলের বাইরে এই ভুলের মাত্রা অনেক বেশি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের উপকূলীয় উচ্চতা আগের মানচিত্রের তুলনায় ৩ ফুটের বেশি নিচে পাওয়া গেছে।

উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের ক্ষেত্রে এই ভুল কম ছিল। কারণ, সেখানে কয়েক দশক ধরে সমুদ্রের উচ্চতা ও মাধ্যাকর্ষণ শক্তির নিখুঁত পরিমাপ রয়েছে। অন্যদিকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উপকূলীয় অঞ্চলে জনঘনত্ব বেশি হলেও সেখানে তথ্যের অনেক ঘাটতি ছিল। ফলে সবচেয়ে জনবহুল উপকূল এখন সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক অন্ধকারের মধ্যে পড়ে গেছে।

সমুদ্রের উপরিভাগকে বিজ্ঞানীরা কীভাবে উপস্থাপন করেন, সেখান থেকেই সমস্যার শুরু। অনেক গবেষণায় জিওআইডি নামের একটি মসৃণ বৈশ্বিক পৃষ্ঠতলের ওপর নির্ভর করা হয়। এটি মাধ্যাকর্ষণের ওপর ভিত্তি করে সমুদ্রপৃষ্ঠের একটি আনুমানিক উচ্চতা। কিন্তু বাতাসের প্রবাহ, জোয়ার-ভাটা, তাপমাত্রা ও লবণের পরিমাণের কারণে স্থানীয় জলস্তর সব সময় ভিন্ন হয়। যখন মানচিত্রে প্রকৃতির এই পরিবর্তন উপেক্ষা করা হয়, তখন একটি কাল্পনিক শূন্য বিন্দু ধরে হিসাব করা হয়। ৩৮৫টি গবেষণাপত্রের মধ্যে ৯৯ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠ এবং স্থলভাগের উচ্চতা সঠিকভাবে সমন্বয় করা হয়নি। প্রায় ৯০ শতাংশ গবেষণায় সমুদ্রের প্রকৃত উচ্চতা কখনোই ব্যবহার করা হয়নি।

ভুল সংশোধন করার পর উপকূলীয় ঝুঁকির বিশ্বব্যাপী চিত্রটি আমূল বদলে গেছে। গবেষকেরা যখন বর্তমান জলস্তরের সঙ্গে ৩ দশমিক ৩ ফুট সম্ভাব্য উচ্চতা বৃদ্ধি যোগ করেন, তখন দেখা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ ৩১ থেকে ৩৭ শতাংশ বেড়ে গেছে। জনসংখ্যার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী ৭ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচের উচ্চতায় বসবাস করছেন। এটি আগের হিসাবের চেয়ে ৪৮ থেকে ৬৮ শতাংশ বেশি। ভিয়েতনামের মেকং ডেল্টায় ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, এলাকাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২ দশমিক ৬ ফুট উঁচুতে। অথচ আগের মানচিত্রগুলোতে একে ৮ দশমিক ৫ ফুট উঁচুতে দেখানো হয়েছিল।

শহর কর্তৃপক্ষ, প্রকৌশলী ও বিমা কোম্পানির জন্য এই ফলাফল উপকূলীয় পরিকল্পনার ভিত্তি বদলে দিয়েছে। বাঁধ নির্মাণ, সরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি বা জলবায়ু অভিযোজন বাজেট সাধারণত পুরোনো মানচিত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। যদি সেই মানচিত্রই ভুল উচ্চতা থেকে শুরু হয়, তবে অনেক জনপদ প্রস্তুতির জন্য ধারণার চেয়ে কম সময় পাবে। ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা ১১ ইঞ্চি থেকে ৩ দশমিক ৩ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে। এখন যদি দেখা যায় সমুদ্র ইতিমধ্যে আমাদের ধারণার চেয়ে উঁচুতে আছে, তবে অভিযোজনের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়ে আসবে। নেচার সাময়িকীতে এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।

সূত্র: আর্থ