
গবেষণাগারে তৈরি বিশেষ ধরনের চোখের কোষ ভবিষ্যতে অন্ধত্ব প্রতিরোধ ও রেটিনার বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যার মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক কোষকে রূপান্তর করে চোখের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ রক্তনালির কোষ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। প্রাণীর ওপর প্রাথমিক পরীক্ষায় এসব কোষ ক্ষতিগ্রস্ত চোখের টিস্যুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বাভাবিক কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতেও সক্ষম হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। মানুষের চোখের রেটিনায় থাকা ‘রেটিনাল এন্ডোথেলিয়াল’ কোষ রক্তনালির অভ্যন্তরীণ স্তর তৈরি করে এবং একটি সুরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এই ব্যবস্থা চোখের সংবেদনশীল টিস্যুতে অক্সিজেন, পুষ্টি, তরল ও অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এসব কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা তাদের কার্যকারিতা কমে গেলে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিসহ বিভিন্ন জটিল রোগ দেখা দিতে পারে, যা একপর্যায়ে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, এমনকি অন্ধত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় রেটিনাল এন্ডোথেলিয়াল কোষ সাধারণত রোগীদের শরীর থেকে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে এসব কোষ সংগ্রহ করা যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া কঠিন। গবেষকদের মতে, নতুন প্রযুক্তি এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে পারে। কারণ, এর মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষাগারেই এসব কোষ তৈরি করা সম্ভব হবে।
গবেষণার সহপ্রধান লেখক পার্কার এসওয়েইন বলেন, রেটিনাল এন্ডোথেলিয়াল কোষের কিছু বিকল্প উৎস থাকলেও শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে এসব কোষ উৎপাদনের সক্ষমতা গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। এ গবেষণায় ব্যবহৃত কোষগুলো সরাসরি রোগীর শরীর থেকে সংগ্রহ করা হয়নি। এর পরিবর্তে গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন ‘ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল’ বা আইপিএসসি। এগুলো মূলত প্রাপ্তবয়স্ক কোষ, যেগুলোকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এমন অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়, যাতে সেগুলো আবার শরীরের প্রায় যেকোনো ধরনের কোষে রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে। তবে স্টেম সেলকে নির্দিষ্টভাবে রেটিনার রক্তনালির কোষে পরিণত করা সহজ ছিল না। এ জন্য গবেষকেরা বিশেষ ধরনের কিছু রাসায়নিক উপাদানের সমন্বয়ে একটি পদ্ধতি তৈরি করেন, যা স্টেম সেলকে রেটিনাল এন্ডোথেলিয়াল কোষে রূপান্তরিত হতে নির্দেশ দেয়। গবেষণাগারে তৈরি এসব কোষ বাস্তব কোষের মতোই জটিল কোষীয় নেটওয়ার্ক গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তা–ই নয়, কম অক্সিজেন ও উচ্চমাত্রার শর্করাযুক্ত পরিবেশের মতো পরিস্থিতিতে সাধারণত রেটিনার ক্ষতি হয়, তাতেও কৃত্রিমভাবে তৈরি কোষগুলোও বাস্তব রোগীর কোষের মতো একই ধরনের পরিবর্তন ও ক্ষয়ের লক্ষণ দেখিয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রগতি। কারণ, এর মাধ্যমে চোখের বিভিন্ন রোগ কীভাবে তৈরি হয় এবং কীভাবে ধীরে ধীরে জটিল আকার ধারণ করে, তা আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন ওষুধ ও সম্ভাব্য চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতাও পরীক্ষাগারে যাচাই করা সহজ হবে।
গবেষক দল রেটিনার রোগে আক্রান্ত, কিন্তু তখনো দৃষ্টিশক্তি হারায়নি, এমন ইঁদুরের চোখে পরীক্ষাগারে তৈরি কোষগুলো প্রতিস্থাপন করে। এতে দেখা যায়, কোষগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর সঙ্গে একীভূত হয়ে নতুন রক্তনালি গঠনে সহায়তা করছে এবং চোখের স্বাভাবিক সুরক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখছে। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির ভিত্তিতে রেটিনার বিভিন্ন রোগের কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি চোখের রোগ নিয়ে গবেষণা ও নতুন ওষুধ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সফল হলে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় এই প্রযুক্তি নতুন আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: ডেইলি মেইল