
বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে ব্রাজিল। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশটি ভ্যাকসিন বা মশা মারার স্প্রে ব্যবহারের পাশাপাশি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্যকর্মীরা বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ জিনগতভাবে পরিবর্তিত (জেনেটিক্যালি মডিফায়েড) মশা ছেড়ে দিচ্ছেন। গবেষণাগারে জন্মানো মশাগুলো ডেঙ্গু রোগ ছড়ানো মশার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্রাজিলের হাসপাতালগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আর তাই নতুন এই পদ্ধতিকে মহামারি মোকাবিলার বড় হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের জন্য আরও এডিস ইজিপ্টি মশা প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়ার ধারণাটি শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এর পেছনে বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এমন পুরুষ এডিস ইজিপ্টি মশা প্রজনন করেছেন, যার মধ্যে একটি পরিবর্তিত জিন রয়েছে। এই পুরুষ মশাগুলো যখন বন্য স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন জন্ম নেওয়া সব স্ত্রী মশা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই মারা যায়। যেহেতু কেবল স্ত্রী মশাই মানুষকে কামড়ায় এবং ডেঙ্গু ছড়ায় তাই এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট এলাকায় রোগ ছড়াতে সক্ষম মশার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা সম্ভব।
গবেষণাগারে মশা প্রজনন করা প্রতিষ্ঠান ওক্সিটেকের তথ্যানুযায়ী, পদ্ধতিটি এর আগে যেসব এলাকায় পরীক্ষা করা হয়েছে, সেখানে স্থানীয় মশার সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা গেছে। মশাগুলোকে উন্মুক্ত করার জন্য ছোট ছোট বাক্স ব্যবহার করা হচ্ছে। বাক্সগুলোর ভেতরে আগে থেকেই মশার ডিম রাখা হয়। ডিমগুলোর ওপর পানি পড়লেই সেগুলো থেকে মশা জন্ম নেয়। এডিস ইজিপ্টি মশা যেভাবে প্রাকৃতিকভাবে পাত্র, বাটি বা পুরোনো টায়ারে জমে থাকা স্থির পানিতে ডিম পাড়ে সেই একই পদ্ধতি এখানে অনুসরণ করা হচ্ছে।
পরিবর্তিত মশা বাক্সের ভেতরে প্রায় ১০ দিনের মধ্যে তাদের সম্পূর্ণ জীবনচক্র সম্পন্ন করে। এরপর প্রাপ্তবয়স্ক মশাগুলো বাক্স থেকে বেরিয়ে আসে এবং মিলনের জন্য চলে যায়। এই পদ্ধতি বর্তমানে ব্রাজিলের বেশ কয়েকটি শহরে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে সাও পাওলো রাজ্যের সুজানো শহর অন্যতম। চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতির কারণে এই শহরেও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
চলতি বছরে ব্রাজিলে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই লাফিয়ে বাড়া সংখ্যার হার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরও চমকে দিয়েছে। প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশনের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বছরের প্রথম দুই মাসেই দেশজুড়ে ১০ লক্ষাধিক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০০ শতাংশের বেশি। ইতিমধ্যে দেশটির বেশ কয়েকটি শহরে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রিও ডি জেনিরোতে বছরের শুরু থেকে ৪২ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া