প্রতীকী ছবি।
প্রতীকী ছবি।

পরমাণুর খোঁজে

যে পরমাণুর নামকরণে সময় লেগেছিল ২৮ বছর

পর্যায় সারণির ১০৪ নম্বর মৌল রাদারফোর্ডিয়াম কৃত্রিমভাবে তৈরি একটি তেজস্ক্রিয় মৌল। এর আবিষ্কারের ইতিহাস মূলত দুই পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার বিজ্ঞানীদের মধ্যকার এক দীর্ঘ প্রতিযোগিতার গল্প।

১৯৬৪ সালে রাশিয়ার ডাবনায় অবস্থিত জয়েন্ট ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার রিসার্চের বিজ্ঞানীরা প্রথম ১০৪ নম্বর মৌলটি আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। জর্জি ফ্লেরোভের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী প্লুটোনিয়াম-২৪২ মৌলকে নিয়ন-২২ আয়ন দিয়ে আঘাত করে এই সাফল্য পান। তাঁরা দাবি করেন, তাঁরা ১০৪ নম্বর মৌলের ২৬০ ভর সংখ্যার একটি আইসোটোপ তৈরি করেছেন—যার আয়ু বা হাফ-লাইফ ছিল ০.৩ সেকেন্ড।

সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা তাঁদের প্রিয় পরমাণুবিজ্ঞানী ইগর কুরচাতোভের নামানুসারে মৌলটির নাম রেখেছিলেন কুরচাতোভিয়াম। তবে পরবর্তী সময়ে আরও উন্নত প্রযুক্তিতে পরীক্ষা চালিয়ে তাঁরা দেখতে পান, আইসোটোপটির হাফ-লাইফ আসলে ০.৩ সেকেন্ড নয়, বরং ০.১ সেকেন্ড। এই তথ্যের পরিবর্তন তাঁদের আগের রাসায়নিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে বিজ্ঞানীদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করে। ১৯৬৯ সালে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে ল্যাবরেটরির একদল বিজ্ঞানী ভিন্ন পদ্ধতিতে ১০৪ নম্বর মৌলটি শনাক্ত করার ঘোষণা দেন। আলবার্ট ঘিওর্সোর নেতৃত্বে এই দলটি ক্যালিফোর্নিয়াম-২৪৯ মৌলকে কার্বন-১২ ও কার্বন-১৩ আয়ন দিয়ে আঘাত করেন। তাঁরা সোভিয়েতদের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী আইসোটোপ তৈরি করতে সক্ষম হন। যার হাফ-লাইফ ছিল ৩ থেকে ৫ সেকেন্ড।

যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা নিউজিল্যান্ডের বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের সম্মানে এই মৌলের নাম প্রস্তাব করেন রাদারফোর্ডিয়াম। তাঁরা তাঁদের দাবির পক্ষে হাজার হাজার পরমাণু তৈরির প্রমাণ তুলে ধরেন। যেখানে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা মাত্র অল্প কয়েকটি পরমাণু তৈরি করতে পেরেছিলেন। আইসোটোপের আয়ু বেশি হওয়ায় আমেরিকানরা সেগুলোর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ এবং ক্ষয়প্রক্রিয়া আরও নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছিলেন।

মৌলটি কে আগে আবিষ্কার করেছেন এবং এর নাম কী হবে, তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশক ধরে বিরোধ চলে। সোভিয়েতরা তাঁদের কুরচাতোভিয়াম নামের পক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে আমেরিকানরা রাদারফোর্ডিয়াম নামটির দাবিতে অটল ছিলেন। অবশেষে ২৮ বছর পরে ১৯৯২ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি এই বিরোধের মীমাংসা করে। তারা সিদ্ধান্ত দেয় যে উভয় দেশের বিজ্ঞানীদের দাবিই যৌক্তিক। তবে চূড়ান্তভাবে ১০৪ নম্বর মৌলটির নাম রাদারফোর্ডিয়াম রাখা হয়।

সূত্র: ব্রিটানিকা