ক্রিপ্টোকারেন্সির জগতের দীর্ঘতম রহস্যে এক নতুন মোড় দেখা যাচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিক জন ক্যারিরুর একটি ১২ হাজার শব্দের বিশদ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ব্রিটিশ ক্রিপ্টোগ্রাফার ও ব্লকস্ট্রিমের সিইও অ্যাডাম ব্যাক বিটকয়েনের উদ্ভাবক। তিনি হ্যাশক্যাশের প্রতিষ্ঠাতা। অ্যাডামই আসলে বিটকয়েনের ছদ্মনামের স্রষ্টা সাতোশি নাকামোতো বলে দাবি করেছেন সাংবাদিক জন।
অ্যাডাম ব্যাক এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ক্রিপ্টো কমিউনিটি এই প্রতিবেদনটিকে সন্দেহ ও চরম বিরক্তির সঙ্গে গ্রহণ করেছে। একসময়কার আলোচিত সিলিকন ভ্যালির উদ্যোক্তা এলিজাবেথ হোমস ও থেরানোসে কেলেঙ্কারি ফাঁস করে বিখ্যাত হওয়া সাংবাদিক ক্যারিরু জানান, ২০২৪ সালের এইচবিও ডকুমেন্টারি ‘মানি ইলেকট্রিক: দ্য বিটকয়েন মিস্ট্রি’ দেখার পর ব্যাকের প্রতি তাঁর আগ্রহ জাগে। সেখানে রিগাতে একটি পার্কের বেঞ্চে ব্যাকের প্রতিক্রিয়া দেখে তাঁর সন্দেহ হয়।
সাংবাদিক ক্যারিরুর আরেক গণমাধ্যম টাইমসের এআই প্রজেক্ট এডিটর ডিলান ফ্রাইডম্যানের সঙ্গে মিলে ১৯৯২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সাইফারপাঙ্ক মেইলিং লিস্টের ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩০৮টি পোস্টের একটি ডেটাবেজ তৈরি করেন। তিনটি আলাদা লিখনশৈলী বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে দেখা যায়, সাতোশির লেখার সঙ্গে অ্যাডাম ব্যাকের মিল সবচেয়ে বেশি।
অ্যাডাম ব্যাক ও সাতোশির লেখায় পূর্ণচ্ছেদের পর ডাবল স্পেস ব্যবহার ও ব্রিটিশ বানান রীতি দেখা যায়। সাতোশির ৩২৫টি স্বতন্ত্র হাইফেন ভুলের মধ্যে ৬৭টি অ্যাডাম ব্যাকের ভুলের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। সাতোশি যখন সক্রিয় ছিলেন, তখন মেইলিং লিস্টে ব্যাক অস্বাভাবিকভাবে নীরব ছিলেন। সাতোশি নিখোঁজ হওয়ার ছয় সপ্তাহ পর ব্যাক আবার বিটকয়েন নিয়ে মন্তব্য শুরু করেন। অ্যাডাম ব্যাক প্রথম ১৯৯৭ সালে বিটকয়েনের মতো একটি বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্কের ধারণা দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অ্যাডাম ব্যাক এক্সে পোস্ট করেন, আমি সাতোশি নই।
প্রতিবেদনের বিপক্ষে অ্যাডাম ব্যাক জানান, যেহেতু তিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে ইলেকট্রনিক ক্যাশ নিয়ে প্রচুর লিখেছেন, তাই যেকোনো অ্যালগরিদম তাঁর লেখার সঙ্গেই সাতোশির মিল খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ব্লকস্ট্রিম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিউইয়র্ক টাইমসের গল্পটি কেবল কিছু খুঁটিনাটি বিষয়ের ব্যাখ্যা ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, এখানে কোনো অকাট্য ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রমাণ নেই।
সাংবাদিক ক্যারিরুর দীর্ঘ প্রতিবেদনে একটি জিনিসের অভাব ছিল, যা এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারত। সেখানে কোনো ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রমাণ নেই। সাতোশির পরিচয় নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো তাঁর আদি বিটকয়েন ব্লক থেকে একটি প্রাইভেট কির মাধ্যমে বার্তা স্বাক্ষর করা। এই প্রতিবেদনে তেমন কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
কম্পিউটেশনাল লিঙ্গুইস্ট ফ্লোরিয়ান ক্যাফিয়েরো ব্যাকের সঙ্গে সাতোশির বিটকয়েন হোয়াইট পেপারের মিলকে অমীমাংসিত বলে বর্ণনা করেছেন। ক্রিপ্টো ইন্ডাস্ট্রি এই প্রতিবেদনের কঠোর সমালোচনা করেছে। বিটকয়েন ডেভেলপার জেমসন লপ বলেন, দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে অ্যাডাম ব্যাকের মতো একজন ব্যক্তির দিকে আঙুল তোলা অত্যন্ত লজ্জাজনক। গ্যালাক্সি ডিজিটালের গবেষণাপ্রধান অ্যালেক্স থর্ন একে আবর্জনা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের তদন্তের একটি মানবিক ঝুঁকিও রয়েছে। সাতোশির ওয়ালেটে আনুমানিক ১১ লাখ বিটকয়েন রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭৮ বিলিয়ন ডলার। কোনো জীবিত ব্যক্তির ওপর এই বিপুল সম্পদের মালিকানা চাপিয়ে দেওয়া তাঁর জীবনের জন্য চরম নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে। এর আগে এইচবিওর ডকুমেন্টারিতে পিটার টডকে সাতোশি দাবি করার পর তিনি আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
বিটকয়েন হোয়াইট পেপার প্রকাশের ১৭ বছর পরও সাতোশির পরিচয় একটি রহস্যই রয়ে গেল। অ্যাডাম ব্যাকের মতে, সাতোশির পরিচয়হীনতাই বিটকয়েনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। এটি বিটকয়েনকে কোনো একক ব্যক্তির সৃষ্টি হিসেবে নয়, একটি গণিতনির্ভর নিরপেক্ষ ডিজিটাল সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করছে এমন পরিচয়হীনতা। ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বিটকয়েনের বাজারদর প্রায় ৭১ হাজার ডলারে স্থিতিশীল ছিল, যা থেকে বোঝা যায় বাজারের বিনিয়োগকারীরা এই নতুন সাতোশি তত্ত্বে খুব একটা বিচলিত নন।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস ও ব্রেভ নিউ কয়েন