
ধর্ম নিয়ে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী মানুষের ধারণা, ধর্ম বুঝি তার আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে স্থির বা অপরিবর্তনীয়। বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস অনুসন্ধানে কিন্তু তার প্রমাণ মেলে না। এক সময় পশু উত্সর্গ করা ছিল হিন্দুধর্মের অনুষঙ্গ; ক্যাথলিক খ্রিষ্টান পাদরিরা চিরকাল কুমার থাকতেন না। অথচ কয়েক হাজার বা কয়েক শ বছর আগের এসব আচরণ এখন আর নেই। প্রতিটি ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে পরিবর্তন এসেছে। এর কারণও আছে।সম্প্রতি বিবিসি অনলাইনে উইলিয়াম ক্রেমারের লেখা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ধর্ম যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মতাদর্শ বদলেছে। ১৮৮৯ সালে উইলফোর্ড উডরাফ মরমন চার্চের চতুর্থ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। এটি যিশুখ্রিষ্টের পরবর্তী সাধুদের চার্চ হিসেবে পরিচিত।অনুসারীরা উডরাফকে মনে করতেন ‘জিন্দা নবী’। তাঁরা ভাবতেন, উডরাফ সরাসরি যিশুখ্রিষ্টের কাছ থেকে জ্ঞান ও উপদেশ নিয়ে থাকেন। কিন্তু সে সময় মরমন চার্চ নিজেই এত সংকটে ছিল যে স্বয়ং উডরাফের উপদেশ নেওয়ার প্রয়োজন পড়েছিল।
মরমন খ্রিষ্টানরা প্রায় ৪০ বছর বহুবিবাহ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত ছিল। মরমন পুরুষেরা বিশ্বাস করতেন, বহুবিবাহ তাঁদের অধিকার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আইনে খ্রিষ্টানদের জন্য তা ছিল নিষিদ্ধ। উডরাফ জীবনে বিয়ে করেছিলেন মোট সাতটি এবং তাঁর সন্তান ছিল ৩৩ জন।
একসময় উডরাফের বিরুদ্ধে বহুবিবাহের অভিযোগে মামলা হয়। কিন্তু সাধুসন্তের জীবন যাপন করে তিনি অনেক বছর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এড়িয়ে পালিয়ে বেড়ান। শেষে ১৮৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার চার্চটির সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিলে উডরাফ মত বদলান।
এ সময় উডরাফ বলেন, স্বপ্নে যিশু তাঁকে মরমন চার্চের ভবিষ্যত্ কেমন হবে, তা দেখিয়েছেন। বহুবিবাহের প্রথা বন্ধ না করলে চার্চের যে ক্ষতি হবে, তা-ও বলে দিয়েছেন যিশু। এরপর উডরাফ বহুবিবাহের নিন্দা না করলেও এ প্রথা চিরতরে বন্ধ ঘোষণা করে একটি লিখিত নির্দেশ জারি করেন।
অনেকের কাছে মনে হতে পারে, সমস্যাটি তেমন জটিল কিছু ছিল না। কিন্তু ভ্যানডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মের ইতিহাসের অধ্যাপক ক্যাথলিন ফ্লেক এমনটি মনে করছেন না। তিনি নিজে একজন মরমন। তিনি বলেন, ‘এটি সামাজিক, ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় দিক দিয়ে খুবই ঝামেলার বিষয়। চার্চের মতামতের এ পরিবর্তনে পুরো মরমন সম্প্রদায় অস্থিতিশীল হয়ে যায়। নতুন ঘোষণা মরমনের মূল আদর্শের ভিত্তিতে তীব্র আঘাত হানে।’
ফ্লেক বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, যে ধর্ম নিজেকে বদলাতে অস্বীকার করে, সে ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু যেসব ধর্মের ‘জিন্দা নবী’ নেই, তাদের বেলায় তবে কী হবে? এসব ধর্ম কীভাবেই বা নিজেকে বদলায়?
কর্মের নতুন ব্যাখ্যা
ম্যাকগ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক অরবিন্দ শর্মা গবেষণা করেছেন, কী করে একটি ধর্ম মতাদর্শ বদলে টিকে থাকে। এ প্রসঙ্গে তিনি মহাত্মা গান্ধীর ‘কর্ম’বিষয়ক ব্যাখ্যার কথা বলেন। হিন্দুধর্মের মতে, কর্মের ফল আছে বা পরবর্তী জীবনে এর জন্য পুরস্কার আছে।
অরবিন্দ বলেন, ‘সনাতন হিন্দুধর্মের জাতিভেদ-প্রথা জায়েজ করতে কর্মের এ ব্যাখ্যা ব্যবহার করা হয়।...এক ব্যক্তি অস্পৃশ্য হয়ে জন্মায়, কারণ সে আগের জীবনে কোনো অপকর্ম করেছে। আর তাই এ জীবনের ভেদপ্রথা তাকে মেনে নিতে হয়।’
গান্ধী সবাইকে দেখিয়ে দিলেন, ব্রিটিশরা সব হিন্দুকে অস্পৃশ্য বলে মনে করে। কারণ, ব্রিটিশরা তাদের ক্লাবের বাইরে নোটিশবোর্ডে লেখে রাখত, ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’।
অরবিন্দ বলেন, গান্ধীর যুক্তি ছিল: ‘দেখেছো কর্ম কীভাবে কাজ করে? তুমি একজনকে জন্মের ভিত্তিতে অস্পৃশ্য বলছো, তাই অন্যরাও তোমাকে অস্পৃশ্য বলে গণ্য করছে।’ এভাবে ‘কর্মের’ নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে গান্ধী কার্যত ধর্মের নতুন ব্যাখ্যা হাজির করেছেন।
তালমুদের শিক্ষা
ইহুদিদের অন্যতম পবিত্র ধর্মগ্রন্থ তালমুদ। এতে একটি কাহিনি আছে যে, ভবিষ্যত্ প্রজন্ম তাদের নিজেদের মতো করে আইন-কানুন ব্যাখ্যা করছে।
নিউইয়র্কের ইহুদি ধর্মতত্ত্ব শিক্ষাকেন্দ্রের রাব্বি বার্ট ভিসোিস্ক তালমুদের এক কাহিনি শোনান। তিনি বলেন, তালমুদের কাহিনিতে আছে, ইহুদিদের নবী মুসা (রা.) সিনাই পর্বতে গেছেন প্রভুর কাছ থেকে তাওরাত গ্রন্থ আনতে। তাওরাত হলো ইহুদিদের আরেকটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। মুসা (রা.) দেখলেন, প্রভু প্রতিটি অক্ষরের ওপর ছোটমতন একটি করে মুকুট বসিয়ে সেগুলো সাজাচ্ছেন। মুসা (রা.) বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, ‘বেশ, আপনি ভালো করেই জানেন, আমি এটা সাদাসিধাভাবেই নেব।’ প্রভু বললেন, ‘না। (এটা তোমার জন্য নয়) অনেক প্রজন্ম পরে আকিভা নামের এক রাব্বি আবির্ভূত হবেন। তিনি এসব মুকুটওয়ালা বর্ণ থেকে নতুন ইহুদি আইন খুঁজে বের করবেন।’ এরপর প্রভু যখন মুসা (রা.)কে আকিভার বাণী শোনালেন, তখন মুসা কিছুই বুঝতে পারলেন না।
বার্ট ভিসোিস্ক বলেন, ‘তালমুদের মূল কথা হলো, সবকিছু বদলাবে, কিন্তু সবকিছুর উত্স হবে ধর্মগ্রন্থ।’
গ্যালিলিওর ব্যাখ্যা
খ্রিষ্টান ধর্মমতে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে। এর বিপরীত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন গ্যালিলিও। তাঁর ব্যাখ্যা চার্চ নয়, ধর্মকেই ভিত্তিহীন করে তুলতে শুরু করেছিল। এ জন্য তাঁর ওপর চার্চ ক্ষেপে যায় এবং সাজা হিসেবে তাঁকে জীবনের শেষ বছরগুলো কারাগারে কাটাতে হয়েছিল।
ভ্যাটিকানের জেসুইট পাদরি গিওর্গি কোইন ২৮ বছর ধরে চার্চে মহাকাশচর্চা করছেন। তিনি বলেন, গ্যালিলিও পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর গবেষণাপত্রে লিখেছিলেন, পবিত্র গ্রন্থগুলোর দুটি মূলকথা আছে। একটি হলো ‘কীভাবে স্বর্গে যেতে হবে’ এবং অন্যটি হলো ‘স্বর্গে কী হয়’।
ক্যাথলিক চার্চ এখন গ্যালিলিওর তত্ত্ব মেনে নিয়েছে। ১৯৯২ সালে পোপ দ্বিতীয় জন পল গ্যালিলিওকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু বিজ্ঞান কি বসে আছে? প্রতিদিন সে চার্চের দিকে কঠিন কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে।
গিওর্গি কোইন বলেন, ‘জেনেটিকস, আণবিক জীববিজ্ঞান এবং বিবর্তন তত্ত্ব নিশ্চিতভাবে চার্চের প্রতি চ্যালেঞ্জ। গ্যালিলিওর ভূত কি এবার আবার কথা কইবে? হ্যাঁ, বলবে। আমার প্রিয় চার্চ! গ্যালিলিওর সময় তুমি যে ভুলটি করেছ, তা হলো বিজ্ঞানের কথা না শোনা।’
চাই অধ্যবসায়
‘ঈশ্বরের ইতিহাস’ (১৯৯৩) গ্রন্থের লেখক কারেন আর্মস্ট্রং বলেন, ‘আমাদের শেষাবধি নিজেদের নিয়ে ভাবার জন্য এক ধরনের সৃষ্টিশীল প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং চারদিকের জটিল জিনিসগুলো সহজ করতে হবে।’ তিনি বলেন, কীভাবে জীবন যাপন করতে হবে, তা হয়তো কেউ ধর্মগ্রন্থ থেকে খুঁজে পেতে চাইতে পারেন, কিন্তু তা ওই গ্রন্থে নাও থাকতে পারে। গাড়ি চালানোর সক্ষমতা কীভাবে অর্জন করা যাবে, তা যেমন গাড়ির ব্যবহারবিধিতে দেওয়া থাকে না, ব্যাপারটি তেমনই। তবে তিনি স্বীকার করেন, যাঁরা এই দ্রুত পরিবর্তিত বিশ্বে স্থির ও অবিচল কোনো মতাদর্শ চেয়ে ধর্মের মুখাপেক্ষী হন, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি খুবই কঠিন। কারণ, তাঁরা চান এমন কিছু, যা থেকে চাওয়ামাত্র উত্তর মিলবে।
‘মুহাম্মদ: নবীর জীবনী’ (১৯৯১), ‘ইসলাম: সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ (২০০০), ‘মুহাম্মদ: এ সময়ের নবী’সহ (২০০৬) বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থের লেখক কারেন আর্মস্ট্রং আরও বলেন, ‘লোকে অনেক সময় ভাবে, ধর্মপালন খুব সহজ। সত্যি হলো, এর জন্য চাই গভীর জ্ঞান, আধ্যাত্মিক ও কাল্পনিক প্রচেষ্টা। এটি এমন এক সংগ্রাম, যা কখনো ফুরায় না।’