নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা প্রশ্নে বিতর্কে চীন-রাশিয়া ফের মিয়ানমারের পাশে

বিশিষ্ট চলচ্চিত্রশিল্পী ও জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থার শুভেচ্ছাদূত কেট ব্লানচেট বক্তব্য রাখছেন। ছবি: জাতিসংঘ তথ্য দপ্তর
বিশিষ্ট চলচ্চিত্রশিল্পী ও জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থার শুভেচ্ছাদূত কেট ব্লানচেট বক্তব্য রাখছেন। ছবি: জাতিসংঘ তথ্য দপ্তর

গতকাল মঙ্গলবার রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বাত্মক হামলা শুরুর প্রথম বার্ষিকীতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আয়োজিত এক উন্মুক্ত বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, মিয়ানমার যত যুক্তিই দেখাক না কেন, সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও তাদের দোসররা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর যে নির্বিচার শক্তি প্রয়োগ ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন করেছে, কোনো যুক্তি দিয়েই তা ন্যায়সংগত প্রমাণ করা যাবে না। এক দিন আগে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক তথ্য অনুসন্ধানী মিশনের প্রতিবেদনের বিষয় উল্লেখ করে মহাসচিব বলেন, এই মিশন মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে প্রমাণ পেয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহই থাকে না, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী আন্তর্জাতিক আইনের চোখে গুরুতর অপরাধ করেছে।

মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয়প্রাপ্ত রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের স্বেচ্ছায় নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু এই চুক্তি বাস্তবায়নে যে অঙ্গীকার প্রয়োজন, তার কোনো লক্ষণ তিনি দেখেন না।

নিরাপত্তা পরিষদের আগস্ট মাসের সভাপতি যুক্তরাজ্যের অনুরোধে ও সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিতর্কে অধিকাংশ বক্তাই মহাসচিবের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে রোহিঙ্গা জাতি নির্মূলকরণ বা এথনিক ক্লেনজিংয়ের অপরাধে অভিযুক্ত মিয়ানমারের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের যথাযথ বিচারের দাবি তোলেন। তাঁরা এ কথাও বলেন, সংকট সমাধানের লক্ষ্যে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের দেশে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও তাদের সুরক্ষার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দায়দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের। সেই অবস্থা সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত উদ্বাস্তুরা ফিরে যাবে—এ কথা আশা করা অন্যায়।

১৫ সদস্যবিশিষ্ট এই পরিষদের প্রায় সব সদস্যই মিয়ানমার সরকার ও তার নিরাপত্তা বাহিনীকে অভিযুক্ত করে বক্তব্য রাখলেও ভিন্ন সুরে কথা বলেন চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত। চীনা রাষ্ট্রদূত উ হাইতাও বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সাম্প্রতিক আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার কথা উল্লেখ করে দাবি করেন, পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তিনি যুক্তি দেখান, এটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—এই দুই দেশের সমস্যা। তাদেরই দ্বিপক্ষীয়ভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। তিনি জানান, উভয় দেশকে সমানভাবে সাহায্য করতে চীন প্রস্তুত। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্ন, জাতিসংঘ যাকে এই সমস্যার একটি মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সে প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত হাইতাও বলেন, সমস্যা সমাধানের একটি পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা ঠিক হবে না, বরং উদ্বাস্তু প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তার সমাধান খুঁজতে হবে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া চীনা প্রতিনিধির বক্তব্য সমর্থন করে বলেন, এটি একটি দ্বিপক্ষীয় সমস্যা। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকেই তার সমাধান করতে হবে। পরিস্থিতির ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, কফি আনান কমিশন যে ৮৮টি সুপারিশ করেছিলেন, তার মধ্যে ৮১টি সুপারিশ হয় ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে অথবা অর্জনের পথে। উল্লেখ্য, মিয়ানমার সরকার বারবার এই দাবি করলেও জাতিসংঘ এই অগ্রগতির ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছে।

গত বছর আগস্টে কফি আনানের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্তর্জাতিক কমিশন যে প্রতিবেদন পেশ করে, তার অন্যতম সুপারিশ ছিল রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, আইনের চোখে সমানাধিকার ও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমনের পূর্ণ স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। এসব সুপারিশের কোনোটাই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

অধিকাংশ বক্তাই রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত নিকি হেইলি বলেন, প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মহানুভবতা দেখিয়েছে, তার ফলে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে। তিনি সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, কক্সবাজারে ১ হাজার ২৪ জন রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর সরাসরি সাক্ষাতের ভিত্তিতে প্রস্তুত এই প্রতিবেদনে ‘জাতি নির্মূলকরণের’ স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। এই পরিকল্পিত জাতি নির্মূলকরণের জন্য একমাত্র দায়ী সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী।

কুয়েতের রাষ্ট্রদূত মনসুর আইয়াদ আলোতাইয়েবিও রোহিঙ্গা নিধনকে ‘জাতি নির্মূলকরণ’ নামে অভিহিত করে বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের স্বেচ্ছায় ফিরে আসার প্রশ্ন ওঠে না। তিনি বলেন, আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার জন্য একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অপর পূর্বশর্ত হলো রোহিঙ্গাদের প্রতি বৈষম্যের মূল কারণ খোঁজে তার সমাধান।

পরিষদের সভাপতি যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ-বিষয়ক মন্ত্রী তারিক মাহমুদ আহম্মদও মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত ও অপরাধীদের যথাযথ বিচারের ওপর জোর দেন। একা মিয়ানমার সরকার নয়, এই বিচারপ্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংযুক্ত থাকতে হবে। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য ভুলে মানবতার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত হাউ ডো সুয়ান পরিষদের সামনে এর আগে প্রদত্ত বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেন, তাঁর সরকার উদ্বাস্তুদের ফেরত নিতে গত ২৩ জানুয়ারি থেকে প্রস্তুত, কিন্তু বাংলাদেশ সরকার উদ্বাস্তু প্রত্যয়নের কাজ শেষ করতে সক্ষম হয়নি। তিনি দাবি করেন, এক বছর আগে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যে অভিযান শুরু করে, তা ছিল তথাকথিত আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির সন্ত্রাসী হামলা বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে। আন্তর্জাতিক তদন্ত মিশনের প্রতিবেদন বাতিল করে তিনি বলেন, এই মিশনের নিরপেক্ষতা বিষয়ে তাঁর গভীর সন্দেহ রয়েছে।

মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য উদ্বাস্তুদের মনে আস্থা জাগাতে হবে, তারা ফিরে এলে নিরাপদে থাকবে এবং বৈষম্যের শিকার হবে না—এমন বিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তেমন আস্থা সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে। আস্থা সৃষ্টি করতে প্রাথমিকভাবে কী করা উচিত, রাষ্ট্রদূত মাসুদ তার একটি তালিকা প্রদান করেন। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী সীমান্তে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন করা, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ ও রোহিঙ্গা নিধনে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিচারপ্রক্রিয়ায় আনা।

এদিনের বিতর্কে সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বক্তব্যটি প্রদান করেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্রশিল্পী ও জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থার শুভেচ্ছাদূত কেট ব্লানচেট। তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে তাঁর সাম্প্রতিক সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি একজন মা। উদ্বাস্তু শিশুদের চোখের দিকে তাকিয়ে আমি নিজের সন্তানদের দেখতে পেয়েছি।’ লায়লা নামের এক উদ্বাস্তু ও তাঁর ছেলে ইউসুফের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে ব্লানচেট বলেন, তাঁরা স্বচক্ষে নিজের ঘরবাড়ি পুড়ে যেতে দেখেছেন। মানুষকে আগুনকে পুড়িয়ে মারা ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন।

‘একজন মা কীভাবে নিজ চোখে তার সন্তানদের আগুনে পড়িয়ে মারার ঘটনা দেখে তা সহ্য করবে, বলতে পারেন?’ তিনি প্রশ্ন রাখেন।

বিতর্কে শেষে পরিষদের সভাপতি তারিক মাহমুদ আহম্মদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘উদ্বাস্তুদের নিরাপদ ফেরত পাঠানোর জন্য চাই প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি। যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিয়েছে, তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তাদের ফেরত যেতে আমরা বলতে পারি না।’ তিনি বলেন, তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টির দায়িত্ব অন্য কারও নয়, মিয়ানমার সরকারে।

পরিষদ সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি রয়েছে, সে কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন প্রথম আলোকে বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের সৃষ্ট নয়, সে এর সঙ্গে কোনোভাবে যুক্তও নয়। এটি মিয়ানমার সরকার ও তার জনগোষ্ঠীর একাংশের ব্যাপার। বাংলাদেশ শুধু মানবিকতার প্রয়োজনে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে নিজের দেশে আশ্রয় দিয়েছে।