
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে পাকিস্তানের সেনাশাসক ইয়াহিয়া খানের সমালোচনা করায় ভারতে নিযুক্ত নিজ দেশের রাষ্ট্রদূত কেনেথ বি কেটিংকে ‘গাদ্দার’ ও ‘ভারতের মুখপাত্র’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। কেটিংয়ের ওপর নিক্সন এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁকে চাকরিচ্যুত করতে চেয়েছিলেন তিনি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম: নিক্সন, কিসিঞ্জার অ্যান্ড এ ফরগটেন জেনোসাইড’ বইয়ে এমন তথ্যই তুলে ধরা হয়েছে। মার্কিন গোপন নথি ও তারবার্তার ওপর ভিত্তি করে বইটি লিখেছেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক গ্যারি বাস। টাইমস অব ইন্ডিয়া এ খবর জানিয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র যে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল, সে কথা কম-বেশি সবারই জানা। তবে সেই বিরোধিতার মাত্রাটা যে কতটা তীব্র ছিল, সেটা আরও খোলাসা হয়েছে এই বইয়ে।
জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও তাঁর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো কটূক্তি শুনতে চাইতেন না যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। পশ্চিম পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে তখন সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের সহায়তায় এগিয়ে আসার ফলে ভারতের সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়ানোর পরিকল্পনা ছিল নিক্সন প্রশাসনের।
তবে তত্কালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেনেথ বি কেটিং ইয়াহিয়ার উত্পীড়নের সমালোচনা করতেন। ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যায় মদদ দিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি। এতেই কেটিংয়ের ওপর খাপ্পা হন নিক্সন।
এই বইয়ে নিক্সন এবং তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে। ওই কথোপকথনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জারকে নিক্সন বলেছিলেন, ‘কেটিং আসলে একটা গাদ্দার।’ তিনি বলেছিলেন, ‘ভারতীয়রা ভয়াবহ, কিন্তু তারা নিশ্চিতভাবেই কেটিংয়ের কাছ থেকে কিছু সহায়তা পাচ্ছে। সে আসলেই ভারতীয়দের মুখপাত্র।’ প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন কিসিঞ্জার।
নিজ দেশের এই রাষ্ট্রদূত সম্পর্কে নিক্সন আরও বলেছিলেন, ‘সে ভারতের অভিবাসী হয়ে গেছে। (ভারত সফরকালে) আমি ভারতীয়দের সঙ্গে কথা বলছিলাম, তাদের অভিযোগগুলো শুনছিলাম। আর কেটিং বারবার বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিল আর বলছিল যে, “আপনি এটা বা ওটা উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন।”’
বইয়ে লেখক গ্যারি বাস বলেছেন, নিক্সনের ওই অভিযোগ ছিল পুরোপুরি মিথ্যা। দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠককালে বিব্রতকর নিস্তব্ধতা ভেঙে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে কেটিং মাত্র একবারই কথা বলেছিলেন।
কিসিঞ্জারের সঙ্গে কথোপকথনে নিক্সন বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় আমাদের তাঁকে সরিয়ে ফেলতে হবে। তাঁর বয়স হয়ে গেছে ৭১ বছর।’ প্রেসিডেন্ট নিক্সনের এই প্রস্তাবে সম্মতি দিলেও সরকারের ভাবমূর্তির কথা বিবেচনা করে তাত্ক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে ছিলেন না কিসিঞ্জার। তিনি নিক্সনকে বলেছিলেন, তাত্ক্ষণিকভাবে কেটিংকে সরিয়ে দিলে কংগ্রেসে অন্য নেতারা ক্ষুব্ধ হবেন। কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘এটা এখন আমাদের অনেক ক্ষতি করবে। আমাদের পরিস্থিতি ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।’ কিসিঞ্জারের যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে নিক্সন দুই বা তিন মাসের মধ্যেই কেটিংকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।