প্রথম আলো ফ্যাক্ট চেক

ধ্বংসস্তূপ থেকে খামেনির দেহ উদ্ধারের ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধারের একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, লাশ উদ্ধারের দৃশ্য দাবি করে প্রচারিত ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি।

গতকাল শনিবার ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। আজ রোববার ভোরে আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনির মৃত্যুর কথা স্বীকার করে ইরান সরকার। ৮৬ বছর বয়সী আলী খোমেনি যে ভবনে ছিলেন, তার একাংশ গুঁড়িয়ে গেছে।

এরপর ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একটি ছবি পোস্ট করা হয়, যাতে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপে আলী খামেনির মরদেহ একটি পিলারের নিচে চাপা পড়ে আছে। তাঁর দেহের পাশেই তাঁর মাথার পাগড়ি ও চোখের চশমাটি পড়ে আছে। উদ্ধারকর্মীরা সেখান থেকে তাঁর লাশ বের করার চেষ্টা করছেন।

ভালো করে ছবিটি দেখলে তাতে বেশ কিছু অসংগতি খুঁজে পাওয়া যায়। ছবিতে আলী খামেনির দেহ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে চাপা থাকলেও শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা যায় না। এমনকি তাঁর সামনে পড়ে থাকা চশমাটিও পুরোপুরি অক্ষত।

সন্দেহ জাগায় নিশ্চিত হতে এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল হাইভ মডারেশন ও এআই অর নট দিয়ে যাচাই করে দেখা গেছে, এই ছবি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রবল।

নেতানিয়াহুর মৃত্যুর গুজব

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মধ্যে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মৃত্যুর একটি গুজবও ছড়িয়েছে। কাতারভিত্তিক টিভি চ্যানেল আল–জাজিরাকে তথ্যসূত্র হিসেবে উল্লেখ করে ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট থেকে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন।

অনুসন্ধান চালিয়ে আল–জাজিরার ওয়েবসাইটে নেতানিয়াহু নিহত হওয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ওয়েবসাইটে নেতানিয়াহুকে নিয়ে একটি আলাদা ট্যাগও রয়েছে। সেখানেও এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন বা তথ্যের অস্তিত্ব মেলেনি।

নেতানিয়াহু নিহত হওয়ার কোনো খবর আন্তর্জাতিক অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমেও পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ইরানি কিংবা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। বরং আজ দুপুরে নেতানিয়াহুর একটি ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয় ইসরায়েলি সংবাদপত্রগুলোতে, যেখানে তিনি ইরানি জনগণকে তাঁদের সরকারকে হটাতে রাস্তায় নামার আহ্বান জানান।

ফলে নেতানিয়াহুর মৃত্যুর যে দাবি করা হচ্ছে, তা তথ্যনির্ভর নয়।

ইসরায়েলি সেনাদের পালানোর ভিডিওটি পুরোনো

ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েলি সেনাদের ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার একটি দৃশ্য দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

অনুসন্ধান চালিয়ে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘Ulusal Kanal’-এর ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবর একই ভিডিওটি পাওয়া যায়। ভিডিওটির শিরোনাম থেকে জানা যায়, সে সময় ইসরায়েলি সেনারা লেবানানে প্রবেশ করলে হিজবুল্লাহর পাল্টা আক্রমণে তাঁরা পালিয়ে আসেন।

তুরস্কভিত্তিক আরেক সংবাদমাধ্যম ‘Sabah’-এর ফেসবুক পেজেও সে সময় ভিডিওটি তোলা হয়েছিল। ওই পোস্ট থেকেও ভিডিওটির বিষয়ে একই তথ্য পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে আরও অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর লেবাননে স্থল অভিযান চালিয়েছিল ইসরায়েল। এর আগে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতেও বিমান হামলা চালায় দেশটি, যাতে নিহত হন হিজবুল্লাহপ্রধান হাসান নাসরুল্লাহ।

এরপর হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলায় বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। আলোচিত ভিডিওটি সেই সময়কার, বর্তমান সংঘাতের নয়।

ইয়েমেনে হামলার পুরোনো ভিডিওকে সৌদিতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি করে প্রচার

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। তার মধ্যে ফেসবুকে একটি ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, সৌদি আরবের রিয়াদে মার্কিন ঘাঁটি পুড়ছে।

খেলাফত আমাদের টার্গেট’ নামের ফেসবুক প্রোফাইলে ১৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘সৌদি আরবের রিয়াদের মার্কিন ঘাঁটি পুড়ছে আলহামদুলিল্লাহ।’ আরও একাধিক প্রোফাইল ও পেজে একই ভিডিও ও ছবি খুঁজে পাওয়া যায়।

সত্যতা যাচাইয়ে কয়েকটি কিফ্রেম রিভার্স সার্চ করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত হুবহু একই ভিডিও সামনে আসে। তার ক্যাপশনে লেখা, ‘ইয়েমেনের হোদেইদাহ বন্দরে হামলা চলছে এবং শত শত বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে।’ ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছে ২০২৪ সালের ২১ জুলাই।

অধিকতর যাচাইয়ে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে প্রকাশিত খবর খুঁজে পাওয়া যায়। আল–জাজিরায় ২০২৪ সালের ২০ জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তেল আবিবে হুতি বিদ্রোহীদের একটি ড্রোন হামলার জবাবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইয়েমেনের হোদেইদাহ বন্দরে বিমান হামলা চালায়। বন্দর এলাকার তেলের ডিপো এবং একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল হামলার লক্ষ্যবস্তু। ফলে সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

অর্থাৎ রিয়াদে মার্কিন ঘাঁটিতে আগুন লাগার দাবিতে যে ভিডিওটি প্রচার করা হচ্ছে, তা এখনকার নয়, দেড় বছর আগের ঘটনার।