
নিয়মিত রোগ পরীক্ষার সময়ই স্তন ক্যানসার শনাক্ত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সহায়ক হতে পারে। আজ শুক্রবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমনটা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বে প্রথমবারের মতো এআই ব্যবহার করে স্তন ক্যানসার শনাক্তের পরীক্ষা চালানোর পর এমন ফলাফল পাওয়া গেছে।
সুইডিশ গবেষকদের নেতৃত্বে পরীক্ষাটি চালানো হয়েছিল। এতে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে গবেষকেরা বলছেন, হাসপাতালগুলো এআই ব্যবহার করে স্তন ক্যানসারের পরীক্ষা চালালে কম জনবলসম্পন্ন রেডিওলজিস্টদের কাজের চাপ কমবে।
২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি আসার আগে থেকেই বিশ্বজুড়ে এআই–বিষযক সচেতনতা বাড়ছিল। বিজ্ঞানীরা চিকিৎসাবিষয়ক কাজে কীভাবে এআইকে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা করছিলেন।
নতুন গবেষণা প্রতিবেদনটি দ্য ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এটি প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা, যেখানে এআই–পদ্ধতিতে স্তন ক্যানসার পরীক্ষা করে এর ফলাফল যাচাই করা হয়েছে।
এক লাখের বেশি নারীকে এ গবেষণার নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। এ নারীরা ২০২১ ও ২০২২ সালে সুইডেনে স্তন ক্যানসারের রুটিন পরীক্ষা করিয়েছিলেন।
গবেষণার জন্য ওই নারীদের দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। একটি দলে এআই পরিচালিত ব্যবস্থা ব্যবহার করে একজন রেডিওলজিস্ট পরীক্ষা চালিয়েছেন। আর আরেকটি দলে স্তন ক্যানসার পরীক্ষার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এ দলে স্তন ক্যানসার পরীক্ষা করতে দুজন রেডিওলজিস্টকে রাখা হয়েছিল।
এআই পরিচালিত পরীক্ষার আওতায় থাকা দলটিতে ৯ শতাংশের বেশি নারীর ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে।
পরবর্তী দুই বছরে এআই দলে থাকা রোগীদের মধ্যে রুটিন পরীক্ষায় ইন্টারভ্যাল ক্যানসার (এক পরীক্ষায় নেগেটিভ আসার পর আরেক পরীক্ষায় পজিটিভ আসা) ধরা পড়ার হার ১২ শতাংশ কম ছিল। তবে দুই দলেই ‘ফলস পজিটিভ’ (আক্রান্ত না হওয়ার পরও আক্রান্ত দেখানো) রিপোর্ট আসার হার একই ছিল।
এ গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্রিস্টিনা ল্যাং বলেন, ‘স্তন ক্যানসার পরীক্ষা ব্যবস্থায় এআই পরিচালিত ম্যামোগ্রাফি ব্যাপকভাবে চালু করলে তা রেডিওলজিস্টদের কাজের চাপ কমাতে সহায়ক হবে এবং সময়মতো আরও বেশি সংখ্যক ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব হবে।’
এক বিবৃতিতে ল্যাং আরও বলেন, অবশ্যই ‘সাবধানে’ ও ‘নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে’ এটা করা উচিত।
ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডিওলজিস্টের প্রধান জাঁ-ফিলিপ ম্যাসন এএফপিকে বলেন, এআই যা শনাক্ত করবে, সেটি ঠিক নাকি ভুল তা রেডিওলজিস্ট তাঁর চোখ ও অভিজ্ঞতার আলোকে নির্ণয় করবেন। কখনো কখনো এআই স্তন টিস্যুর এমন পরিবর্তন শনাক্ত করে, যা আসলে ক্যানসার নয়।
ম্যাসন আরও বলেন, ফ্রান্সে রেডিওলজিস্টদের মধ্যে এআই ব্যবহারের প্রবণতা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। কারণ, এআই–চালিত ব্যবস্থা ব্যয়বহুল এবং বাস্তবতার চেয়ে বেশি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রোগ নির্ণয় করার ঝুঁকি থাকে।
লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিফেন ডাফি বলেছেন, এই গবেষণায় দেখা গেছে, এআই পরিচালিত ব্যবস্থায় ক্যানসার পরীক্ষা সাধারণত নিরাপদ।
ডাফি উল্লেখ করেছেন, গবেষণার অংশ হিসেবে যে দলটির ওপর এআই পরিচালিত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে ইন্টারভ্যাল ক্যানসারের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, অপর দলটিতে পরীক্ষার ফলাফল সমান হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য আরও ফলোআপ জরুরি।
২০২৩ সালে গবেষণাটির মধ্যবর্তী ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল। এতে দেখা যায়, এআই ব্যবহার করলে স্তন ক্যানসার পরীক্ষা করতে রেডিওলজিস্টদের প্রায় অর্ধেক সময় কম লাগবে।
পরীক্ষায় এআই–চালিত যে মডেলটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটির নাম ট্রান্সপারা। এর আগে ১০টি দেশের ২ লাখের বেশি পরীক্ষা–নিরীক্ষার ভিত্তিতে এটিকে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২২ সালে ২৩ লাখের বেশি নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৬ লাখ ৭০ হাজার রোগী মারা গেছেন।