যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেন। নিউইয়র্ক, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেন। নিউইয়র্ক, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘে ভাষণ

ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি, চুক্তিতে পৌঁছারও প্রত্যাশা ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। পাশাপাশি মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর দেশটির সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছারও প্রত্যাশা করেছেন।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মঙ্গলবার দেওয়া বক্তৃতায় ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ ছাড়াও নানা বিষয়ে কথা বলেন।

ট্রাম্প বলেন, তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি ইরানের সঙ্গে চুক্তি করবেন, নাকি দেশটিকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেবেন। তাঁর এই বক্তব্য মূলত যুদ্ধ দেখে ক্লান্ত আমেরিকান ভোটারদের মন জয় করার মতো করে সাজানো বলেই মনে হয়েছে। ৮০ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্টের এমন হুমকি আসে মূলত তাঁর এমন সব আত্মতুষ্টিমূলক দাবির মধ্য দিয়ে, যেখানে তিনি বারবার আত্মপ্রচার করেন—তাঁর নেতৃত্বেই যুক্তরাষ্ট্র সাফল্যের সঙ্গে প্রতিপক্ষদের মোকাবিলা করছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যবস্থাকে নিজের সুবিধাজনক অবস্থানে নিতে নতুন রূপ দিচ্ছেন।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘অন্যরা যখন কেবল শান্তির কথা বলেছে, আমি তখন শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছি। অন্যরা যখন হুমকিগুলোকে উপেক্ষা করে গেছে, আমি তখন সেগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মোকাবিলা করেছি।’

নিজেকে শান্তিদূত হিসেবে দাবি করা সত্ত্বেও, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধকে ন্যায্য প্রমাণের চেষ্টা করতে গিয়ে তেহরানকে কঠিন সতর্কবার্তা দেন। তিনি জানান, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতেই এই যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল।

আমার বিশ্বাস, নির্বাচনের পরপরই (ইরানের সঙ্গে) আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, কারণ চুক্তি না করাটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট

ট্রাম্প বলেন, ‘আমাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ইরানের সঙ্গে কি এমন কোনো চুক্তি করা হবে, যা তাদের আবার ঘুরে দাঁড়াতে এবং আরও বড় একটি দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে? নাকি আমি এই ইসলামিক রিপাবলিককে সম্পূর্ণরূপে গুঁড়িয়ে দেব এবং তা করব খুব দ্রুতগতিতে, যেন তারা মানুষকে এবং বিভিন্ন দেশকে ধ্বংস করার সুযোগ আর কখনোই না পায়? আমি কি তাদের এমন নরকে ঠেলে দেব, যেখান থেকে তাদের বেঁচে ফেরার বা ঘুরে দাঁড়ানোর আর কোনো পথই থাকবে না?’

ট্রাম্প আবারও তাঁর বিশ্বাসের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ‘পরপরই’ ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, নির্বাচনের পরপরই আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, কারণ চুক্তি না করাটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।’

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। যার অন্যতম কারণ অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি।

ট্রাম্প বলেন, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের জন্য ইরান অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, ‘তারা (ইরান) যা বুঝতে পারছে না তা হলো, আমি এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি না।’ তিনি আরও বলেন, তিনি ইতিমধ্যেই বিপুল ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।

এই নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, যার অন্যতম কারণ অজনপ্রিয় এই যুদ্ধের ফলে জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি।

‘সামরিক শক্তি’

ট্রাম্পের ভাষণের বাকি অংশের অনেকটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ’ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজের অর্জনগুলোর প্রচার ও গুণগানে। লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের স্বার্থ সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শক্তি’ প্রয়োগের হুমকি দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, কমিউনিস্ট–শাসিত দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা খুব ‘শিগগির পতনের’ মুখে পড়বে।

গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে হওয়া একটি চুক্তির প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, এই চুক্তির অধীনে আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলে ওয়াশিংটন দুটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করবে। জাতিসংঘের সম্মেলনের ফাঁকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প।

তবে গ্রিনল্যান্ডের এই চুক্তি ন্যাটোসহ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে তীব্র মতভেদ তৈরি করেছে এবং ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটন আর নির্ভরযোগ্য অংশীদার নয়—এমন আশঙ্কাকে আবার উসকে দিয়েছে।

অস্থিরচিত্ত এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ (আইসিসি) বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর সমালোচনা করেন। এই সংস্থাগুলোকে বর্জন করার জন্য তিনি অন্যান্য দেশের প্রতি আহ্বান জানান।

ট্রাম্পের ৩৭ মিনিটের ভাষণটি হয়তো গত বছরের চেয়ে কিছুটা কম বিস্ফোরক ছিল, যেখানে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জাতিসংঘকে নিয়ে অদ্ভুত সব অন্তর্ঘাতের (স্যাবোটাজ) অভিযোগ উঠেছিল। সেসব অভিযোগ তখন উঠেছিল, যখন নিউইয়র্কে চলন্ত সিঁড়ি (এস্কেলেটর) সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং টেলিপ্রম্পটারে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। এ বছর অবশ্য স্ত্রী মেলানিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাম্প কোনো বিঘ্ন ছাড়াই চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠেন এবং টেলিপ্রম্পটার দেখেই বেশ নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর ভাষণটি পাঠ করেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সূচনা বক্তব্য দেন বিদায়ী মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। নিউইয়র্ক, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গুতেরেসের হুঁশিয়ারি

প্রেসিডেন্ট পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প নিয়মিতভাবে জাতিসংঘ এবং এর মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের তীব্র সমালোচনা করে আসছেন। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণে ‘জাতিগত নিধনের যে আশঙ্কা বা ছায়া’ দেখা দিয়েছে, তা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে ভাষণ শুরু করেন গুতেরেস। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি মার্কিন-চীন সংলাপের আহ্বান জানান এবং বৈশ্বিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বায়ুমণ্ডলকে ‘উন্মুক্ত নর্দমা’ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য কঠোর সমালোচনা করেন।

ট্রাম্পের ভাষণ দেওয়ার ঠিক আগেই বক্তব্য দেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা। ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতিবছর বিশ্বনেতাদের এই বার্ষিক সম্মেলনে সব সময় ব্রাজিলের নেতাই প্রথম বক্তব্য দিয়ে আসছেন।