নতুন বছরে বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো কী কী প্রযুক্তি আসতে পারে

২০২৫ সালে প্রযুক্তি বিশ্বে অনেক কিছুই ঘটেছে। তবে দুটি শব্দই সব শিরোনাম দখল করে রেখেছিল—‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। গুগল, ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এআই প্রযুক্তিতে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছে। শুধু তা–ই নয়, এআই এখন আমাদের ব্যবহারের প্রায় প্রতিটি প্রযুক্তিপণ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৬ সালের প্রযুক্তিপ্রবণতাগুলোতে এআই যুক্ত থাকবে। জেনারেটিভ এআই এবং লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো প্রযুক্তি বিশ্বে তাদের আধিপত্য বজায় রাখবে।
এআইয়ের বাইরেও আগামী বছর আরও নমনীয় ডিসপ্লেসহ নতুন সব ফোল্ডেবল ফোনের দেখা পাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া কনজিউমার মার্কেটে প্রচুর রোবট দেখা যাবে। অ্যাপল, স্যামসাং, গুগল ও মাইক্রোসফটের নিয়মিত উদ্ভাবন তো থাকছেই। দেখে নিন কী কী ঘটতে যাচ্ছে নতুন বছরে—

স্মার্ট চশমা চোখে মেটা সিইও মার্ক জাকারবার্গ

স্মার্ট চশমা

প্রযুক্তি বিশ্বে আগামী বছর স্মার্ট চশমা ব্যবহারের প্রবণতা বাড়বে। ইতিমধ্যে মেটা ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে তাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা দেখিয়েছে। মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ জনসমক্ষে মেটা রে-ব্যান স্মার্ট চশমা পরেছেন। সিলিকন ভ্যালির অনেক নেতার মতোই জাকারবার্গও এখন স্মার্ট চশমার ওপর বাজি ধরছেন।

স্যামসাং, অ্যাপল এবং গুগল—সবাই নিজস্ব স্মার্ট চশমা তৈরি করছে বলে গুঞ্জন আছে বা বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে আমরা এক্সরিয়েল ওয়ান প্রো এআর চশমার উন্মোচনও দেখা গেছে। আগামী বছর আরও অনেক স্মার্ট এআর চশমা বাজারে আসতে পারে।

সিলিকন ভ্যালির কর্মকর্তারা একে ব্যক্তিগত কম্পিউটিংয়ের ভবিষ্যৎ মনে করছেন। তবে এ নিয়ে কিছুটা সংশয়ও আছে। মেটাভার্স নিয়ে জাকারবার্গ এর আগে চরম ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। মানুষ সাধারণত প্রয়োজনের খাতিরেই চশমা পরে। এ ছাড়া গোপনীয়তার প্রশ্ন তো আছেই। ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনযুক্ত চশমা পরে কেউ আপনার প্রতিটি কথোপকথন রেকর্ড করছে—এটা অনেকেই পছন্দ করবেন না।

ভাঁজ করা ফোন বাজারে চলে এসেছে

ভাঁজ করা ফোন

একসময় ভাঁজ করা মোবাইল ফোন শখের বশে অনেকে ব্যবহার করতেন। কিন্তু মূলধারায় আসছে ফোল্ডেবল ফোন। বছরের পর বছর ধরে এগুলো বাজারে আছে; কিন্তু এ ধরনের ফোনের ব্যবহার নিয়ে বেশ কিছু সমস্যা ছিল। তবে সমস্যাগুলো এখন নেই বললেই চলে।

মটোরোলা রেজর আল্ট্রা বা গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৭-এর মতো ফোনগুলো এর প্রমাণ। তবে এই বাজারে অ্যাপলের প্রবেশের অপেক্ষায় সবাই চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে। ফোল্ডেবল ফোন ভুলে যান, এবার তৈরি হন ট্রাই-ফোল্ডিং (তিন ভাঁজ করা যায় এমন) ফোনের জন্য।

২০২৬ সালে অবশেষে ‘আইফোন ফোল্ড’-এর অভিষেক ঘটতে পারে। যদি কেউ এ প্রযুক্তিকে মূলধারায় নিয়ে আসতে পারে, তবে তা হলো অ্যাপল। ২০২৫ সাল যদি আল্ট্রা-থিন ফোনের বছর হয়, তবে ২০২৬ হবে ফোল্ডেবল ফোনের বছর।

ওপেনএআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বিশ্বাস করেন এজিআই হাতের নাগালে।

হাতের নাগালে এজিআই

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এআইয়ের উন্নতি চলবে, তবে ২০২৬ সালে এজিআই অধরাই থাকবে। এজিআই বা আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স হলো এআই শিল্পের পরম লক্ষ্য। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যা মানুষের সমান বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন।

সহজ কথায়, এটি কোনো মানুষের তত্ত্বাবধান ছাড়াই প্রায় সব কাজ করতে পারবে। এ লক্ষ্যেই এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে। অনেকে মনে করেন, এআই চ্যাটবটগুলো এনএফটির মতো সাময়িক উন্মাদনা মাত্র। তবে ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বিশ্বাস করেন, এজিআই হাতের নাগালে।

তবে বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আর আগের মতো জ্যামিতিক হারে উন্নতি করতে পারছে না। জিপিটি-৫ যখন এ বছর মুক্তি পায়, তখন অনেকেই হতাশ হয়েছিলেন। তাই, ২০২৬ সালে এজিআই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতেই থেকে যাবে, নাকি বাস্তবে রূপ নেবে, তার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে।

অ্যাপল এখন ফোল্ডেবল ফোন ও এআই প্রযুক্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে পিছিয়ে আছে।

চাপে পড়বে অ্যাপল

২০২৬ সালটি মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অ্যাপলের গুছিয়ে ওঠার বছর হতে পারে। ২০২৫ সালে অ্যাপল অনেক পণ্য বাজারে ছেড়েছে। এর মধ্যে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স থেকে শুরু করে এম৫ চিপযুক্ত ম্যাকবুক প্রো ও ভিশন প্রো রয়েছে। তা সত্ত্বেও অ্যাপল এখন কিছুটা চাপে আছে। তাদের ‘আইফোন এয়ার’ বাজারে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। এম৫ ডিভাইসগুলো গত বছরের মডেলের মতোই।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ফোনগুলো এখন আসছে স্যামসাং বা শাওমির মতো কোম্পানি থেকে। অ্যাপল এখন ফোল্ডেবল ফোন এবং এআই প্রযুক্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে পিছিয়ে আছে। অনেক বড় মাপের নির্বাহীও প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে যাচ্ছেন।

২০২৬ সালে হয়তো ফোল্ডেবল আইফোন বা এআই-চালিত সিরি আসবে। তবে অ্যাপল বর্তমানে নিজেকে নতুন করে সাজানোর পর্যায়ে রয়েছে।

টেসলা হয়তো এ বছর অপটিমাস বিক্রি শুরু করবে।

মানবসদৃশ রোবট

২০২৬ সালে বাজারে আসবে আরও হিউম্যানয়েড (মানবসদৃশ) রোবট। ২০২৫ সালে আমরা টেসলার ডিনারে পপকর্ন পরিবেশনকারী ‘অপটিমাস’ বোট বা চীনা কোম্পানি অ্যাহেডফর্মের ‘অরিজিন এম১’-এর মতো রোবটের অনেক ভিডিও দেখেছি।

১এক্স  নামের একটি কোম্পানি ‘নিও’ নামক হিউম্যানয়েড গৃহকর্মীর প্রি-অর্ডার নিতে শুরু করেছে। টেসলা হয়তো এ বছরে অপটিমাস বিক্রি শুরু করবে। মানবদেহ রোবটের জন্য আদর্শ কাঠামো না হলেও মানুষের মতো দেখতে রোবটের প্রতি আমাদের এক অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করে।

লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল এবং কম্পিউটার ভিশন ব্যবহারের ফলে রোবটগুলো এখন মানুষের নির্দেশে আরও স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিতে পারবে। সিইএস ২০২৬-এ এ ধরনের চমৎকার সব রোবট দেখা যেতে পারে।

সঙ্গ দেবে রোবট।

এআই সঙ্গী

২০২৫ সালে অনেকের সঙ্গী হয়েছে ভার্চু৵য়াল এআই। একাকী বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুদের জন্য এআই সঙ্গীর ব্যবহার দেখা যাবে এ বছর। অনেকেই চ্যাটবটের ওপর আবেগপ্রবণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

২০২৫ সালে আমরা এআই-চালিত খেলনার প্রথম জোয়ার দেখেছি। ২০২৬ সালে আমরা এমন সব রোবট হয়তো দেখব, যা ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথা বলবে, সঙ্গ দেবে এবং মানসিকভাবে শান্ত করবে। এগুলো ভবিষ্যতে আরও উন্নত হবে।

ডিসপ্লে প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে।

ডিসপ্লে প্রযুক্তি

২০২৫ সালের প্রায় সব নতুন ডিভাইস আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন শুধু নামমাত্র উন্নতির দিকে নজর দিচ্ছে। অ্যাপল ওয়াচ আল্ট্রা ৩-এর ব্যাটারি একটু বেশি ভালো হতে পারে; কিন্তু ৯৯ শতাংশ ফিচার আল্ট্রা ২-এর মতোই।

টিভি বা হেডফোনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ডিসপ্লে প্রযুক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষের চোখ আর উন্নতির পার্থক্য ধরতে পারছে না।

স্মার্টফোনের দাম বেড়ে যেতে পারে।

স্মার্টফোনের দাম

ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনের দাম আরও বাড়তে পারে। কারণ, এআই শিল্প। স্যামসাং তাদের মেমোরি ড্রাইভের (র‍্যাম) দাম দ্বিগুণ করছে। ফলে এইচপি, ডেল বা লেনোভোর মতো ব্র্যান্ডগুলো তাদের পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছে। বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের যে সংকট চলছে, তাতে পকেট আরও বেশি খালি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এআই দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিজ্ঞাপন।

এআই বিজ্ঞাপন

এআই বিজ্ঞাপনের জয়জয়কার চারদিকে এখন। চলচ্চিত্র নির্মাণ বা বিজ্ঞাপনে এআইয়ের ব্যবহার শিল্পীদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিলেও বড় কোম্পানিগুলো তাতে পাত্তা দিচ্ছে না।

ম্যাকডোনাল্ডস বা কোকাকোলার মতো প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে এআই বিজ্ঞাপন তৈরি করেছে। ইউটিউবে এআই ভিডিও বা ‘অভিনেতা’ এখন সাধারণ দৃশ্য। গুগল ও লুমাএআই-এর মতো কোম্পানিগুলো যেভাবে উন্নতি করছে, তাতে বিজ্ঞাপন ও সিনেমায় এআইয়ের ব্যবহার রোখা আর সম্ভব নয়।

২০২৫ সালের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রযুক্তির বিবর্তনের গতি কেবল ত্বরান্বিতই হচ্ছে। তাই, ২০২৬ সালের জন্য যাঁরা আগে থেকে প্রস্তুতি নেবেন এবং নতুন সুযোগগুলোকে গ্রহণ করবেন, তাঁরাই আগামী দিনগুলো নিয়ন্ত্রণ করবেন।

তথ্যসূত্র : ম্যাশেবল, রয়টার্স, এএফপি