ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর প্রতীকী ছবি
ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর প্রতীকী ছবি

অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের রোগীদের বেঁচে থাকার সময় দ্বিগুণ করতে পারে নতুন ওষুধ

জটিল অগ্ন্যাশয় ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের বেঁচে থাকার সময় দ্বিগুণ করে দিতে পারে নতুন আবিষ্কৃত একটি ওষুধ। অগ্ন্যাশয় ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ওপর দৈনিক মুখে খাওয়ার এ ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে এমন ফল পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ক্যানসার–সংক্রান্ত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এ ওষুধ আবিষ্কারকে কয়েক দশকের মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অগ্রগতিগুলোর একটি এবং ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বর্তমানে অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের তেমন কার্যকর চিকিৎসা নেই। বিদ্যমান অনেক চিকিৎসাই রোগীদের তেমন উপকার করতে পারে না। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এই ক্যানসার মোকাবিলায় নতুন সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, অগ্ন্যাশয় ক্যানসার সাধারণত অনেক দেরিতে শনাক্ত হয়। অর্ধেকের বেশি রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার পর রোগটি ধরা পড়ে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে আয়োজিত বিশ্বের বৃহত্তম ক্যানসারবিষয়ক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা আশার খবর দিয়েছেন। তাঁরা এ রোগের চিকিৎসায় ডারাক্সোনরাসিব নামে নতুন আবিষ্কৃত একটি ওষুধের প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মতে, এ ওষুধ অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের চিকিৎসায় এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।

৫০০ রোগীর ওপর এ ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া রোগীরা সবাই এমন ধরনের অগ্ন্যাশয় ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন, যা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ডারাক্সোনরাসিব নামের ওষুধটি রোগীদের বেঁচে থাকার সময় প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম ছিল।

শিকাগোতে চলমান আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির (অ্যাসকো বার্ষিক সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা এ ওষুধ গ্রহণ করেছেন, তাঁরা গড়ে ১৩ মাস ২ দিন বেঁচে ছিলেন। অন্যদিকে, কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের গড় বেঁচে থাকার সময় ছিল মাত্র ৬ মাস ৬ দিন বা ৭ দিন।

ডারাক্সোনরাসিব ওষুধটি বিশেষভাবে ক্রাস নামের একটি প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এ প্রোটিন প্রায় সব ধরনের অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওষুধটি ক্রাস প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করার মধ্য দিয়ে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি থামাতে সাহায্য করে।

ক্রাস হলো রাস জিন পরিবারের একটি অংশ। এই জিনে ত্রুটি বা মিউটেশন হলে ক্যানসার কোষগুলো বারবার বৃদ্ধি ও বিভাজনের সংকেত পেতে থাকে। এর ফলে ক্যানসার দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সবচেয়ে সাধারণ ধরনের অগ্ন্যাশয় ক্যানসার হিসেবে পরিচিত প্যানক্রিয়াটিক ডাক্টাল অ্যাডিনোকারসিনোমাতে আক্রান্ত ৯০ শতাংশের বেশি রোগীর ক্রাস জিনে একটি মিউটেশন হয়ে থাকে। এটি রাস জি১২ ভ্যারিয়েন্ট নামে পরিচিত। এ মিউটেশনের কারণে ক্রাস প্রোটিন অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে ক্যানসারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।

ডারাক্সোনরাসিব হলো রাস নিষ্ক্রিয়কারী নতুন ধরনের ওষুধ। এর বিশেষত্ব হলো, ক্রাস জিনে মিউটেশন থাকুক বা না থাকুক, কিংবা যে ধরনের মিউটেশনই থাকুক না কেন, এটি ক্রাস প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করে ক্যানসারের বৃদ্ধি রোধ করতে পারে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার অ্যাকশনের প্রধান নির্বাহী পলা হ্যানফোর্ড বলেছেন, এটি অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের চিকিৎসায় তাঁর দেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতিগুলোর একটি।

হ্যানফোর্ড বলেন, অনেক দিন ধরেই অগ্ন্যাশয় ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের জন্য চিকিৎসার সুযোগ খুবই সীমিত ছিল এবং বেঁচে থাকার হারও উদ্বেগজনকভাবে কম ছিল। কার্যকারিতা পরীক্ষায় ওষুধটি গুরুতর পর্যায়ের অগ্ন্যাশয় ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের বেঁচে থাকার সময় প্রায় দ্বিগুণ করার যে সম্ভাবনা দেখিয়েছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এটি রোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য সত্যিকার অর্থে আশা তৈরি করেছে।

প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার ইউকের সেবা, গবেষণা ও উদ্ভাবন বিভাগের পরিচালক অ্যানা জুয়েলও নতুন এ আবিষ্কারকে স্বাগত জানিয়েছেন।

জুয়েল বলেন, ডারাক্সোনরাসিব ওষুধটি ক্রাস মিউটেশনের কার্যক্রম বন্ধ করার মাধ্যমে উন্নত পর্যায়ের অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের রোগীদের বেঁচে থাকার সময় বৃদ্ধি করতে সক্ষম। এ ওষুধের কারণে রোগীরা তাঁদের প্রিয়জনদের সঙ্গে আরও কয়েক মাস অতিরিক্ত সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন।

তবে অ্যানা জুয়েল মনে করেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এ ধরনের নতুন ওষুধ রোগীদের কাছে সহজলভ্য করা।

শিকাগোতে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, রাস জিনটি শুধু অগ্ন্যাশয় ক্যানসার নয়, আরও অনেক ধরনের ক্যানসারের বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। ফলে এ ক্ষেত্রে পাওয়া সাফল্য অন্যান্য ক্যানসারের চিকিৎসায়ও নতুন অগ্রগতির পথ খুলে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, ফুসফুস ও কোলন ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।