এইএসের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে বামাকো সফরে যাওয়া বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ত্রাউরে (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) মালির প্রেসিডেন্ট কর্নেল আসিমি গোইতার সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছেন। ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, বামাকো
এইএসের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে বামাকো সফরে যাওয়া বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ত্রাউরে (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) মালির প্রেসিডেন্ট কর্নেল আসিমি গোইতার সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছেন। ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, বামাকো

বুরকিনা ফাসো, মালি ও নাইজারের ঐক্য কি সাহেল অঞ্চলের চেহারা বদলাতে পারবে

মালি, বুরকিনা ফাসো আর নাইজার সাহেল অঞ্চল নিয়ে নতুন একটি জোট করেছে যার নাম এইএস। সম্প্রতি এই জোটের নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন হয়ে গেল। সেই অনুষ্ঠান কাভার করতে গিয়েছিলেন আল–জাজিরার সাংবাদিক নিকোলাস হক। এই জোট কি সাহেল অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলাতে পারবে? এসব নিয়ে লিখেছেন তিনি। গত ৩১ আগস্ট আল–জাজিরার অনলাইন সংস্করণে লেখাটি প্রকাশিত হয়।

‘বামাকোতে স্বাগত!’ মালির রাজধানী বামাকোর বিমানবন্দরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মালি সরকারের সঙ্গে যুক্ত একদল লোক। তাঁরা বিনীত, হাস্যোজ্জ্বল—কিন্তু বেশ সতর্ক।

ডিসেম্বরের শেষের দিকে আমরা সেনেগালের ডাকার থেকে ‘এয়ার বুরকিনা’–এর একটি ফ্লাইটে সাহেল অঞ্চল পাড়ি দিয়েছি। গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং সশস্ত্র সহিংসতার এক ঝড় এই অঞ্চলকে অস্থির করে তুলেছে।

মালি এখন এক বড় পরিবর্তনের কেন্দ্রে। ২০২০ ও ২০২১ সালে দুটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটি তার সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, ফরাসি বাহিনীকে বহিষ্কার করেছে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনকে বের করে দিয়েছে এবং তার আন্তর্জাতিক মিত্রদের তালিকা নতুন করে সাজিয়েছে।

বুরকিনা ফাসো ও নাইজারের সঙ্গে মিলে মালি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ‘অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস’ (এইএস) গঠন করে। এই তিন দেশই এখন রুশ ভাড়াটে যোদ্ধাদের সমর্থনপুষ্ট সামরিক সরকারের মাধ্যম শাসিত। এই আঞ্চলিক গোষ্ঠীটি বৃহত্তর পশ্চিম আফ্রিকান দেশগুলোর জোট ‘ইকোওয়াস’ (ইসিওডব্লিউএএস) থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

তিন দেশের নেতারা একটি নতুন ‘সাহেল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ উদ্বোধন করেন, যার লক্ষ্য পশ্চিমা ঋণদাতাদের ওপর নির্ভর না করে অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করা। এ ছাড়া সাহেল অঞ্চলের মানুষের কথা বলতে তৈরি করা একটি নতুন টেলিভিশন চ্যানেল এবং আন্তসীমান্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য একটি যৌথ সামরিক বাহিনীও গঠন করা হয়।

এই তিন দেশের সরকারের অভিযোগ, ইকোওয়াস আফ্রিকান স্বার্থের বদলে বিদেশি স্বার্থ রক্ষা করছে।

গত ডিসেম্বর মাসে জোটের তিন দেশের নেতারা বামাকোতে ‘এইএস রাষ্ট্রপ্রধানদের কনফেডারেল শীর্ষ সম্মেলনে’ মিলিত হন। জোট গঠনের পর এটি ছিল এ ধরনের দ্বিতীয় বৈঠক। আমরা সেখানে গিয়েছিলাম সেই ঘটনা কাভার করতে।

শীর্ষ সম্মেলনটি ছিল অনেকটা নতুন শুরুর মুহূর্ত। তিন দেশের নেতারা একটি নতুন ‘সাহেল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ উদ্বোধন করেন, যার লক্ষ্য পশ্চিমা ঋণদাতাদের ওপর নির্ভর না করে অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করা। এ ছাড়া সাহেল অঞ্চলের মানুষের কথা বলতে তৈরি করা একটি নতুন টেলিভিশন চ্যানেল এবং আন্তসীমান্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য একটি যৌথ সামরিক বাহিনীও গঠন করা হয়।

নতুন চুক্তিতে সই করার চেয়ে এই শীর্ষ সম্মেলন নিজেদের অর্জনগুলো উদ্‌যাপন করার একটি মুহূর্ত ছিল।

কিন্তু এই ঘোষণাগুলোর পেছনের জরুরি কারণগুলো শীর্ষ সম্মেলন হলের বাইরেই রয়ে গিয়েছিল।

এই বিভক্তি ও পরিচয়ের লড়াইয়ের সুযোগে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কেবল নিজেদের জায়গা করে নেয়নি; বরং শক্তিশালীও হয়েছে। আল-কায়েদার সহযোগী সংগঠন জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন (জেএনআইএম) মালির গ্রামাঞ্চল থেকে নিজেদের বিস্তার ঘটিয়ে বেনিনের উপকূল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তারা রাষ্ট্রের দুর্বল উপস্থিতি ও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে নানা অঞ্চলে হামলা চালাচ্ছে।

বিমান যখন বামাকোর দিকে নামছিল, আমি জানালার বাইরে ধূসর মাটির বিশাল বিস্তৃতির দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম—এর কতটা এখন আল-কায়েদা সহযোগীদের দখলে।

জ্বালানি তেলের সংকট রয়েছে মালিতে। তাই জ্বালানি তেল নিতে পেট্রলপাম্পে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছেন মানুষ

বিমানবন্দর থেকে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য দ্রুত গাড়ি চালিয়ে আমাদের শহরের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। চারপাশে মোটরসাইকেলের ভিড়, হকারদের হাঁকডাক আর স্পিকারে মালির পপ গান বাজছিল। দেখে মনে হবে না এটি অবরুদ্ধ কোনো রাজধানী।

অথচ সামরিক সরকারের মতে, গত সেপ্টেম্বর থেকেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বামাকোকে ঘিরে অবরোধ তৈরি করে রেখেছে। এর ফলে জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আমরা যখন পেট্রলপাম্পগুলোর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, দেখলাম রাত পর্যন্ত মানুষের দীর্ঘ সারি। জ্বালানির তীব্র সংকট থাকলেও জীবন থেমে নেই। মানুষ ধৈর্য ধরে জ্বালানি নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। ক্ষোভের জায়গা নিয়েছে একধরনের উদাসীনতা। আবার গুঞ্জনও আছে, কর্তৃপক্ষ শহরকে সচল রাখতে সেই সব যোদ্ধার সঙ্গেই গোপন সমঝোতা করেছে, যাঁদের বিপক্ষে তাঁরা লড়ছে বলে দাবি করছে।

‘এক দেশ হওয়া, একে অপরের হাত ধরা’

আমাদের নিরাপত্তারক্ষীরা আমাদের ‘সাহেল অ্যালায়েন্স স্কোয়ারে’ নিয়ে গেলেন। তিন দেশের ঐক্য ও জনগণকে সম্মান জানাতে এই নতুন জনসমাবেশস্থলটি তৈরি করা হয়েছে।

পথে মালির সামরিক বাহিনীর গাড়িগুলো দ্রুতগতিতে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল—সম্ভবত কোনো লড়াইয়ের ময়দানে। জেএনআইএমের বন্দুকধারীরা ইদানীং রাজধানীতে আসার বাণিজ্য পথগুলোয় চেকপোস্ট বসিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সশস্ত্র গোষ্ঠী বামাকোর ভেতরে একটি এলিট পুলিশ স্কুল ও সামরিক বিমানবন্দরে সমন্বিত হামলা চালিয়েছিল। তবু বামাকো এমনভাবে চলছে, যেন যুদ্ধটা অনেক দূরের কোনো দেশের বিষয়।

সাহেল অ্যালায়েন্স স্কোয়ারে কয়েক শ তরুণ সমবেত হয়ে মালির বাহিনীকে দেখে উল্লাস করছিলেন। তাঁরা সেখানে এসেছিলেন গান, মঞ্চে কুইজ প্রতিযোগিতা আর ছোটখাটো পুরস্কারের লোভে।

প্রশ্নগুলো ছিল সহজ—এইএসভুক্ত দেশগুলোর নাম কী? নেতাদের নাম কী?

এখন মালিতে ফরাসি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বেতার নিষিদ্ধ। একসময়ের ফরাসিভাষী পশ্চিম আফ্রিকার প্রাণকেন্দ্রে ফরাসি সংবাদমাধ্যম এখন ‘হস্তক্ষেপের’ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্স কেবল তার প্রভাব হারায়নি, বিশ্বাসযোগ্যতাও হারিয়েছে। তাদের এখন স্থিতিশীলতার গ্যারান্টার হিসেবে নয়; বরং অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে দেখা হয়।

শিশুদের হাতে মাইক তুলে দেওয়া হলো। জোট নেতাদের নামগুলো তাদের মুখস্থ করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল—নাইজারের আবদুরাহমান তিয়ানি, বুরকিনা ফাসোর ইব্রাহিম ত্রাউরে এবং মালির আসিমি গোইতা। নামগুলো বারবার বলা হচ্ছিল যতক্ষণ না তাদের মনে গেঁথে যায়।

সঠিক উত্তরের জন্য পুরস্কার ছিল তিন নেতার ছবিসংবলিত টি-শার্ট।

১২ বছর বয়সী মুসা নিয়ারে সেই টি-শার্টটি আঁকড়ে ধরেছিল। সে আমাদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘তারা এক দেশ হওয়ার জন্য, একে অপরের হাত ধরার জন্য এবং অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।’ তরুণদের মধ্যে আনুগত্য তৈরির সরকারি চেষ্টা সফল বলেই মনে হলো।

ফ্রান্স বিদায়, রাশিয়ার প্রবেশ

মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারের রাজনৈতিক পরিবর্তন আলাদাভাবে ঘটলেও তাদের এই জোটে আসার পথটি ছিল অনেকটা একই রকম।

২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতিটি দেশেই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতাদের হটিয়ে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। এই সেনা অভ্যুত্থানকে ‘প্রয়োজনীয় সংশোধন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

মালিতে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম আবুবাকার কেইতা দুর্নীতি দমন ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন—এমন অভিযোগে মাসের পর মাস প্রতিবাদের পর কর্নেল আসিমি গোইতা ক্ষমতা দখল করেন।

বুরকিনা ফাসোয় নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে যাওয়ায় ২০২২ সালের শুরুতে সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট রোচ মার্ক ক্রিশ্চিয়ান কাবোরেকে ক্ষমতাচ্যুত করে। পরে ক্যাপ্টেন ত্রাউরে আরেকটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা নেন এবং বিদ্রোহ দমনে আরও কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দেন।

নাইজারে জেনারেল তিয়ানির নেতৃত্বাধীন সৈন্যরা ২০২৩ সালের ২০ জুলাই প্রেসিডেন্ট মোহামেদ বাজোমকে আটক করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, সরকার জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থ এবং বিদেশি অংশীদারদের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

আলাদাভাবে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে যা শুরু হয়েছিল, তা এখন একটি যৌথ রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। বামাকোর এই শীর্ষ সম্মেলন ছিল সেই ইউনিয়নের একটি আনুষ্ঠানিক রূপ।

শীর্ষ সম্মেলনের বড় একটি সিদ্ধান্ত ছিল, একটি যৌথ সামরিক ব্যাটালিয়ন গঠন, যার কাজ হবে পুরো সাহেল অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করা।

বিগত বেসামরিক সরকারগুলোর সময় এই অঞ্চলে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের শক্তিশালী কূটনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি ছিল। ফরাসি সৈন্যরা স্বাধীনতার পর থেকেই এখানে ছিল। সর্বশেষ অভ্যুত্থানের পর তাদের সেখান বের করে দেওয়া হচ্ছে। সামরিক শাসকেরা এখন ‘সার্বভৌমত্ব’–কে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উভয় দিক থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট আলোচিত ব্যক্তি ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাউরে

২০২২ সালে মালি থেকে শেষ ফরাসি সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়। একসময় সেখানে পাঁচ হাজারের বেশি সৈন্য ছিলেন, যা ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর জন্য কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়।

তবে তার আগেই ফরাসি কূটনীতি এই অঞ্চলের মানুষের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল। সাধারণ আঞ্চলিক মুদ্রা ‘সিএফএ ফ্রাঙ্ক’ সেই ক্ষোভের এক বড় প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মুদ্রা এখনো ফরাসি ট্রেজারির সঙ্গে যুক্ত।

এখন মালিতে ফরাসি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বেতার নিষিদ্ধ। একসময়ের ফরাসিভাষী পশ্চিম আফ্রিকার প্রাণকেন্দ্রে ফরাসি সংবাদমাধ্যম এখন ‘হস্তক্ষেপের’ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্স কেবল তার প্রভাব হারায়নি, বিশ্বাসযোগ্যতাও হারিয়েছে। তাদের এখন স্থিতিশীলতার গ্যারান্টার হিসেবে নয়; বরং অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে দেখা হয়।

সারা সাহেলেই এখন ফরাসিবিরোধী মনোভাব তীব্র। মজার ব্যাপার হলো, এই প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে সেই ফরাসি ভাষাতেই—উপনিবেশিকদের ভাষাই এখন প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠেছে।

এ যেন যুক্তিসংগত অংশীদারত্ব

শীর্ষ সম্মেলনের শেষে মালির গোইতা জোটের আবর্তনশীল নেতৃত্ব বুরকিনা ফাসোর ত্রাউরের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

তরুণ, ক্যারিশম্যাটিক এবং প্যান-আফ্রিকানিজমের নতুন ‘রকস্টার’ হিসেবে ত্রাউরে বিশেষ করে তরুণদের মন জয় করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুশপন্থী এবং আফ্রিকাপন্থী ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে তাঁর ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ ও বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

ত্রাউরে প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা কৃষ্ণাঙ্গরা কেন একে অপরের প্রতি ঘৃণা পোষণ করছি এবং ভণ্ডামি করে নিজেদের ভাই বলছি? আমাদের সামনে দুটি পথ—হয় সাম্রাজ্যবাদের চিরতরে অবসান ঘটানো, অথবা বিলীন হওয়ার আগপর্যন্ত দাস হয়ে থাকা।’

বুরকিনা ফাসোয় সামরিক শাসনের সমালোচনা করা সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের ত্রাউরের প্রবর্তিত নীতি অনুযায়ী জোর করে ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমর্থকদের দাবি, সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য শেষ পর্যন্ত এটি প্রয়োজনীয়।

অনুষ্ঠানের আগে আমরা মালির অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করি। প্রথমে তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু সাহেল অঞ্চলের জন্য ঘোষিত বিশাল সব অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি কিছুটা থতমত খেয়ে গেলেন। তাঁর মুখ থেকে মাইক্রোফোন সরিয়ে নেওয়া হলো। পরে ক্যামেরা বন্ধ হলে তিনি আমাকে বলেন, ‘ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আইএমএফ কোনো ঋণ ছাড় করবে না।’

সরকারের মুখপাত্র আমার প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে আমাকে এক পাশে ডেকে নিলেন। তিনি আমার স্যুটের কলার ঠিক করতে করতে কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, তিনি ‘কেবল মজার জন্য’ মাঝেমধ্যে সাংবাদিকদের কারাগারে ভরার কথা ভাবেন।

ওই মুখপাত্র আমার প্রতিষ্ঠানের দিকে আঙুল তোলেননি, তুলেছেন আমার ফরাসি পাসপোর্টের দিকে; আমার আনুগত্যের দিকে। আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমার আনুগত্য সত্যের প্রতি। তিনি হাসলেন, যেন উত্তরটি তাঁর সন্দেহকেই নিশ্চিত করল।

মালির সামরিক বাহিনীর যাঁরা বছরের পর বছর যুদ্ধের ময়দানে কাটিয়েছেন, তাঁদের দৃষ্টিতে সাংবাদিক এবং সমালোচকেরাই সমস্যার অংশ। তাঁদের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। মুখপাত্রের ব্যাখ্যায়, এই জোটই হলো সেই সমাধান, যা তাঁরা ‘ইকোওয়াস’-এ খুঁজে পাননি।

অর্ধশতাব্দীর পুরোনো পশ্চিম আফ্রিকার সংস্থা ‘ইকোওয়াস’ গড়তে এই তিন দেশ একসময় সহায়তা করেছিল। এখন তাদের নেতাদের মতে, সেখানকার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টরা জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। তাঁরা কেবল একে অপরকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত। এর বিকল্প হিসেবে তাঁরা এইএসকে তুলে ধরছেন।

সাহেল জোট বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব নেতা নতুন অবকাঠামোও তৈরি করছেন।

বামাকোতে তাঁদের নতুন টেলিভিশন চ্যানেল চালুর প্রস্তুতি চলছিল। ‘অন এয়ার’ সাইন জ্বলছিল। আধুনিক ক্যামেরাগুলো ট্রাইপডের ওপর চকচক করছিল।

চ্যানেলের পরিচালক সালিফ সানোগো আমাকে বললেন, এটি হবে ‘অপপ্রচার মোকাবিলার একটি হাতিয়ার’, যা পশ্চিমা এবং বিশেষ করে ফরাসি বয়ানকে প্রতিহত করবে। এই চ্যানেল ‘সাহেল অঞ্চলের মানুষের কণ্ঠ’–কে তুলে ধরবে।

মজার বিষয় হলো, ক্যামেরাগুলো বিদেশ থেকে কেনা। এগুলো স্থাপন করার কাজ তদারকি করেছে একটি ফরাসি প্রতিষ্ঠান। এই বৈপরীত্য নিয়ে কারোর কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না।

জোটের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে চ্যানেলটির পরিচালক একটি উপমা দিলেন। তিনি বললেন, ‘এটি যুক্তিসংগত অংশীদারত্ব। তিনজনের সংসারে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ। কিন্তু ১৫ জনের সংসার (ইকোওয়াসের দিকে ইঙ্গিত করে) হলে সেখানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।’

আমরা এটিও টিকিয়ে রাখব

জোট গঠনের দুই বছরের মধ্যে তারা ইকোওয়াসের চেয়েও দ্রুত কাজ করেছে। একটি যৌথ সামরিক বাহিনী তাদের সীমান্তগুলোকে এক সুতায় বেঁধেছে। তাদের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশের অভ্যুত্থান বা বাইরের চাপকে এখন আর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং যৌথ হুমকি হিসেবে দেখা হবে।

একটি নতুন ব্যাংক, যা পশ্চিমা ঋণ ছাড়াই রাস্তা, জ্বালানি ও খনিজ উত্তোলনে অর্থায়ন করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি একটি অভিন্ন মুদ্রা নিয়েও আলোচনা চলছে।

নিজের দেশের বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এই তিন দেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকে বেরিয়ে এসে একটি ‘সাহেল দণ্ড আদালত’ গঠনের প্রস্তাব করেছে। এটাকে কেউ দেখছেন স্বদেশে ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনা হিসেবে, আবার কেউ দেখছেন বিচার বিভাগকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হিসেবে।

এখানে যা গড়ে উঠছে, তা কেবল একটি জোট নয়; বরং একটি বিকল্প, যা তাদের সমালোচকদের চোখের সামনেই দ্রুত তৈরি করা হচ্ছে।

ইকোওয়াস যেখানে নির্বাচন ও আলোচনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিয়ম তৈরি করত, সেখানে এইএস গুরুত্ব দিচ্ছে কাঠামোর ওপর। ইকোওয়াস যেখানে ধৈর্যের কথা বলে, এইএস সেখানে গতির কথা বলে।

সমর্থকদের কাছে এটি হলো দীর্ঘদিনের পরাধীনতার পর মর্যাদা ফিরে পাওয়া। আর সমালোচকদের কাছে এটি হলো উর্দির নিচে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং মুক্তির নামে দমন-পীড়ন চালানো।

নেতৃত্ব গ্রহণ করার সময় ত্রাউরে তাঁর ভাষণে নতুন করে শত্রুর পরিচয় তুলে ধরলেন, কোনো আল-কায়েদা নয়, আইএসআইএল নয়, এমনকি ফ্রান্সও নয়; বরং তিনি তাঁর আফ্রিকান প্রতিবেশীদেরই ঘরের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করলেন। তিনি একটি ‘গভীর সংকট’ নেমে আসার সতর্কতা দিলেন, যা অনলাইনে লাখ লাখ মানুষ দেখেছে।

ত্রাউরে প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা কৃষ্ণাঙ্গরা কেন একে অপরের প্রতি ঘৃণা পোষণ করছি এবং ভণ্ডামি করে নিজেদের ভাই বলছি? আমাদের সামনে দুটি পথ—হয় সাম্রাজ্যবাদের চিরতরে অবসান ঘটানো, অথবা বিলীন হওয়ার আগপর্যন্ত দাস হয়ে থাকা।’

শীর্ষ সম্মেলনের সেই উত্তপ্ত পরিবেশের বাইরে বামাকোর রোদেলা আকাশে জীবন চলছিল তার আপন ছন্দে। রাস্তাঘাটে মালির বিখ্যাত সংগীতশিল্পী আমাদু ও মারিয়ামের গান বাজছিল। আমাদু এই বছরেই হঠাৎ মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর সুর রয়ে গেছে।

মারিয়ামের সেই গানের কলি যেন এসব জোটের চেয়েও বড় কোনো সত্যের কথা বলছিল। এটি কোনো চুক্তি বা উর্দির মাধ্যমে গড়া ঐক্য নয়; বরং মানুষের সহ্যক্ষমতার ঐক্য।

গানটির কথা ছিল—‘সাবলি’ (সবুর বা ধৈর্য)। ‘আমরা খারাপ সময় পার করেছি। আমরা এটিও জয় করব।’