মার্কিন বাহিনীর বিদায় ও আফগানিস্তানে সংখ্যাগত যত পরিবর্তন

পশ্চিমা বাহিনী সড়ে যাওয়া মাত্র কাবুল দখলে নেওয়ার অপেক্ষায় তালেবান বাহিনী।
ফাইল ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সৈন্যরা ২০ বছরের যুদ্ধের পর অবশেষে আফগানিস্তান ছাড়ছে। অথচ যে তালেবানকে পরাজিত করতে তারা এ দেশে এসেছিল, সেই তালেবানই পুরোনো রূপে ফিরে আসছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও দখলদারি চলছে। চলছে তুমুল লড়াই। চালাচ্ছে হত্যাকাণ্ড। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সরকারি বাহিনীর সদস্যরা পালাতে বাধ্য হচ্ছেন। এরই মধ্যে তালেবান দাবি করেছে, তারা দেশটির ৮৫ শতাংশ দখল করে নিয়েছে। ২০ বছরের যুদ্ধ কীভাবে আফগানিস্তানকে বদলে দিয়েছে, তা নিয়ে সংখ্যার বিচারে বিবিসি নিউজ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

২০০১ সাল থেকে কত মানুষ নিহত হয়েছে

গত ২০ বছরের লড়াইয়ে আফগানিস্তান ও সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী পাকিস্তানে হাজারো যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। শুধু যে যোদ্ধারাই মারা গেছেন তা নয়, মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর বিমান হামলা ও তালেবানকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় বহু বেসামরিক মানুষেরও প্রাণ গেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ‘উল্লেখযোগ্য হারে বেশি’ ছিল। জাতিসংঘের দিক থেকে বলা হচ্ছে, এর কারণ হলো ঘরে তৈরি বোমা বা আইইডির ব্যবহার এবং আগে থেকে আক্রমণের লক্ষ্য স্থির করে চালানো হত্যাকাণ্ড। আফগানিস্তানে ২০২০ সালে যত বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন, তার মধ্যে ৪৩ শতাংশই নারী ও শিশু।

ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স, ব্রাউন ইউনিভার্সিটির সূত্রের বরাত দিয়ে বিবিসির এক হিসাবে বলা হয়, ২০০১-২১ সাল পর্যন্ত মার্কিন ও এর মিত্র বাহিনীর ৩ হাজার ৫৮৬ জন নিহত হয়েছেন। পুলিশ ও সেনাসদস্যের মৃত্যু হয়েছে ৭৫ হাজার ৯৭১ জনের (এর মধ্যে আফগানিস্তানের ৫১ হাজার ৬১৩ ও পাকিস্তানের ২৪ হাজার ৩৫৮), বেসামরিক মানুষ নিহত হয় ৭৮ হাজার ৩১৪ জন (এর মধ্যে আফগানিস্তানের ৬৯ হাজার ও পাকিস্তানের ৯ হাজার ৩১৪) আর তালেবানসহ বিরোধী যোদ্ধাদের সংখ্যা ৮৪ হাজার ১৯১ (৫১ হাজার ১৯১ ও পাকিস্তানের ৩৩ হাজার)।

যুদ্ধের মুখে কতজন ঘর পালিয়েছে

বছরের পর বছর ধরে এ যুদ্ধে বহু মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়েছে পালিয়েছে। অনেকে প্রতিবেশী দেশে শরণার্থী হয়েছে বা অনেকে দূরের দেশে আশ্রয় চেয়েছে। আর দেশের ভেতর থাকা বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ আফগান মানুষকে অবর্ণনীয় কষ্ট ও ক্ষুধায় দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।

নিজ দেশে গৃহহীন হয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে শরনার্থী শিবিরে। কাবুল, ২০ জুন, ২০১৯,

গত বছর ৪ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০১২ সাল থেকে ৫০ লাখ মানুষ দেশ থেকে পালিয়েছে, যারা আর নিজের ঠিকানায় ফিরতে পারেনি। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যার দিক দিয়ে আফগানিস্তানতৃতীয়। প্রথম স্থানে রয়েছে সিরিয়ার (৬৭ লাখ) মানুষ আর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভেনেজুয়েলার (৪০ লাখ) মানুষ।

জাতিসংঘের অফিস হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্সের তথ্যমতে, আফগানিস্তানের ৩০ শতাংশের বেশি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতি বা সংকটাপন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

কাবুলে জারগুনা হাইস্কুল, ১৫ আগস্ট, ২০১৫

মেয়েরা কি এখন স্কুলে যেতে পারছে

তালেবান শাসনের ইতি ঘটলে দেশটিতে নারীদের শিক্ষা ও অধিকারের কিছু ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট পরিবর্তন ঘটে। ১৯৯৯ সালে সেখানে উচ্চমাধ্যমিকে কোনো মেয়ে শিক্ষার্থী ছিল না। আর প্রাথমিক স্কুলে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার। অথচ ২০০৩ সালে মেয়ে স্কুলশিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ২৪ লাখ। এ সংখ্যা এখন ৩৫ লাখ। আর সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশ এখন নারী।

২০০৩ সালে উচ্চমাধ্যমিকে মেয়েশিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬ শতাংশ আর ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ শতাংশ।

কিন্তু ইউনিসেফের তথ্যমতে, এখনো দেশটিতে ৩৭ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে। আর তাদের ৬০ শতাংশই মেয়ে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, চলমান যুদ্ধ, পর্যাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থার অভাব ও নারী শিক্ষকের ঘাটতি।

তালেবানের ভাষ্য, তারা নারীদের শিক্ষার বিরোধী নয়; কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, কিছু কিছু তালেবান নেতা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে মূলত মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালের পর স্কুলে যাওয়াকে অনুমোদন দেন না।

বেড়েছে নারীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা

আফগানিস্তানের পার্লামেন্ট ভবন

আফগানিস্তানে নারীরা এখন সরকারি কর্মকাণ্ডেও অংশ নিচ্ছেন, তাঁরা রাজনৈতিক পদে আসীন হচ্ছেন এবং অনেকে ব্যবসা করছেন। ২০১৯ সাল নাগাদ এক হাজারের বেশি আফগান নারী নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেছেন, যা তালেবান শাসন কায়েম থাকলে নিষিদ্ধ হতো।

দেশটির সংবিধানে বলা হয়েছে যে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে কমপক্ষে ২৭ শতাংশ পদ নারীদের পেতে হবে। এখন আফগান পার্লামেন্টে নারীর সংখ্যা এ অনুপাতের সামান্য বেশি, ২৪৯ আসনের মধ্যে নারী এমপি আছেন ৬৯।

জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও অ্যামনেস্টির বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, মাত্র ৫ শতাংশ নারী কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। ২২ শতাংশ নারী কর্মজীবী। সরকারি চাকরিজীবী ২০ শতাংশ নারী। এমপিদের মধ্য ২৭ শতাংশ হচ্ছেন নারী।

জীবনধারায় কতটা পরিবর্তন এসেছে?

আফগানিস্তানে অবকাঠামো–সংক্রান্ত অনেক সমস্যা থাকলেও মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে। দেশটিতে দিন দিনই মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশটিতে ৮৬ লাখের বেশি লোক ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করছেন। সংখ্যাটি মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। এ ছাড়া লাখ লাখ লোক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন।

মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ৬৮ শতাংশ লোক মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। কিন্তু জাতিসংঘ বলছে, মোবাইল সেবায় অনেক সময়ই বিভ্রাট ঘটে এবং তা যোগাযোগের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

আফগানিস্তানে ব্যাংক হিসাব

আফগানিস্তানে প্রাপ্তবয়স্কদের ৮০ শতাংশেরই কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতেও এর চেয়ে বেশি মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে। এর কারণ হিসেবে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছাড়াও বিশ্বব্যাংক বলছে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসও প্রভাব ফেলে। আরও দুটি কারণ হলো, অর্থ খাতের ওপর লোকজনের আস্থার ও আর্থিক জ্ঞান খুব কম। অবশ্য বিশ্বব্যাংক মনে করছে, নতুন কিছু প্রকল্পের কারণে আগামী পাঁচ বছরে ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা অনেকটা বাড়বে।

গ্লোবাল ফিনডেস্ক ডেটাবেইসের বরাত দিয়ে বিসিসির জানায়, দেশটিতে ৮৫ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব নেই। যাঁদের ব্যাংক হিসাব আছে, তাঁদের মধ্যে ২৩ শতাংশ পুরুষ ও ৭ শতাংশ নারী। অন্যদিকে পাকিস্তানে ২১ শতাংশ, ভারতে ৮০ শতাংশ ও যুক্তরাষ্ট্রে ৯৩ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে।

গ্রামীণ অর্থনীতির মূল উৎস আফিম

বিশ্বে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আফিম উৎপাদিত হয় আফগানিস্তানে। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, যুক্তরাজ্যে যে পরিমাণ হেরোইন যায়, এর ৯৫ শতাংশই আফগানিস্তান থেকে যায়।

বিশ্বে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আফিম উৎপাদিত হয় আফগানিস্তানে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, গত ২০ বছরে দেশটির আফিম উৎপাদন ব্যাপক বেড়েছে। দেশটির ৩৪টি প্রদেশের ১২টি ছাড়া সব কটিতে আফিম চাষ হয়। আফিম চাষ নির্মূল কর্মসূচি নেওয়ার পরও এবং চাষিদের বিকল্প কৃষিপণ্য—ডালিম বা জাফরান—চাষে প্রণোদনা দেওয়ার পরও এই অবস্থা দেখা যায়।

তালেবানও ২০০১ সালে আফিম চাষের ওপর স্বল্পমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও এটি দিন দিন তাদেরসহ অন্যদের কাছে কোটি কোটি ডলার আয়ের উৎস হয়ে ওঠে। আফিমচাষিদের প্রায়ই বিরোধী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে আয়কর দিতে হয়।

আর পপি চাষ যে বাড়ছে, তার পেছনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং কর্মসংস্থানের অভাবকে প্রধান কারণ বলে মানা হয়।