নেপালে দুই দিনের রক্তক্ষয়ী গণবিক্ষোভ ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর নিরাপত্তা ফেরানোর দায়িত্ব নিয়েছে সেনাবাহিনী। আন্দোলনকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। চলমান সংকট সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের প্রস্তুতি চলছে। বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ‘জেন-জি’রা। তাঁদের দাবি, গণ-আন্দোলন ‘ছিনতাই’ হয়ে গেছে।
দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিলে গত মঙ্গলবার পদত্যাগে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি। পদত্যাগ করেন তাঁর মন্ত্রিসভার আরও কয়েকজন সদস্য। চলমান এ সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে পেতে সহযোগিতার জন্য বিক্ষোভকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানান প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাওদেল।
সেনাবাহিনী বলেছে, বিক্ষোভপরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং সমস্যার সমাধান করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সমন্বয় করছে। সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, সরকার ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে আলোচনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি বলরাম কে সি বিক্ষোভকারীদের আলোচনার জন্য একটি দল গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নতুন নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানান তিনি। এই সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেন, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া উচিত এবং নতুন নির্বাচন হওয়া উচিত। তাদের পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করা উচিত।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘জেন-জি’ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেল। এ ছাড়া তাঁদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মহাসচিবেরও। গতকাল বুধবার তিনি জানান, অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নাম প্রস্তাব করেছেন বিক্ষোভকারীরা।
দুই দিনের টানা বিক্ষোভ, সংঘাত ও রক্তপাতের পর নেপালে থমথমে অবস্থা বিরাজ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর মঙ্গলবার রাতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে সেনাবাহিনী। রাজধানী কাঠমান্ডুতে কারফিউ বলবৎ রয়েছে। জনশূন্য রাজপথে সাঁজোয়া যানের টহল দেখা গেছে। দোকানপাট ছিল বন্ধ। অবশ্য ২৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর গতকাল কাঠমান্ডুর প্রধান বিমানবন্দর সচল হয়েছে।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত বলেন, বিভিন্ন জায়গায় আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ করছেন অগ্নিনির্বাপণ কর্মীরা। সড়কগুলো পরিষ্কার করে যান চলাচলের উপযোগীর চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি। আমরা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
দুর্নীতি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অব্যাহত ক্ষোভের মধ্যে নিবন্ধনের অজুহাত তুলে শুক্রবার ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ নিষিদ্ধ করে সরকার। এতে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
সোমবার কয়েক হাজার তরুণ রাজধানী কাঠমান্ডুসহ নেপালের আরও সাতটি শহরে রাজপথে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের এই বিক্ষোভ দমনে কঠোর হয় সরকার। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে সেদিন ১৯ জন নিহত এবং কয়েক শ আহত হন।
বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারের অতিরিক্ত বল প্রয়োগের প্রতিবাদে পরদিন ভোর থেকেই তাঁরা আবার রাস্তায় নামেন। তাঁদের থামাতে কারফিউ জারি করা হয়। বিক্ষোভকারীরা কারফিউ উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, পার্লামেন্টসহ সরকারি ভবন এবং মন্ত্রীদের বাড়ি ও দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর চালান এবং আগুন দেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল জানায়, এই সংঘাতে নিহত বেড়ে ২৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ৬৩৩ জন।