
চীনের গাড়ির শিল্প এখন বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ইউরোপ থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া—সবখানেই বাড়ছে চীনা গাড়ির বিক্রি। ফলে টয়োটা ও ফক্সওয়াগনের মতো দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।
তবে চীনের নিজের বাজারে চিত্রটি একদম ভিন্ন। গত বছরের শেষ দিক থেকে সেখানে গাড়ির বিক্রি ক্রমাগত কমছে। ক্রমেই কমে আসা চাহিদা এবং দীর্ঘদিন ধরে দাম নিয়ে চলা প্রতিযোগিতার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাড়ির বাজারে এখন প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত গাড়ি অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে।
বিওয়াইডি, গিলি ও চেরির মতো শীর্ষস্থানীয় চীনা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ববাজারে বড় অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে। তবে বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এখন কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়; বরং অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই তারা বিশ্ববাজারে মনোযোগ বাড়াচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ বাজারে মন্দার কারণে চীনা কোম্পানিগুলো এখন দেশের বাইরে ব্যবসা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে ইউরোপ ও জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো আরও বেশি চাপে পড়বে। কারণ, তারা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এবং সাশ্রয়ী দামের চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
সাংহাইয়ের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অটোমোবিলিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিল রুশো বলেন, ‘চীনা গাড়ি নির্মাতাদের উৎপাদন ক্ষমতা এখন চাহিদার চেয়ে বেশি। তাদের সরবরাহব্যবস্থা অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং পণ্যগুলোও আধুনিক। ফলে চীনের বাইরে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য তাদের সামনে বড় অর্থনৈতিক তাগিদ রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক বাজারে যাওয়া এখন তাদের জন্য কৌশলগতভাবে জরুরি হয়ে পড়েছে।
চায়না প্যাসেঞ্জার কার অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিসিএ) তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে চীনের বাজারে গাড়ি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ কমেছে। এ মাসে বিক্রি হয়েছে ১৪ লাখ ৭০ হাজার গাড়ি। এটি ছিল টানা দশম মাসের মতো গাড়ি বিক্রি কমে যাওয়ার ঘটনা। অন্যদিকে একই সময়ে গাড়ি রপ্তানি ৮৮ শতাংশ বেড়ে ৯ লাখ ২৩ হাজারে পৌঁছেছে।
সংগঠনটির প্রধান কুই ডং শু এই মন্দার পেছনে তেলের উচ্চমূল্য এবং কম দামি সাধারণ সেডান গাড়ির চাহিদা কমে যাওয়াকে দায়ী করেছেন। মূলত চীনের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই গাড়িশিল্পে প্রতিফলিত হচ্ছে। একদিকে কারখানা ও রপ্তানি সচল রয়েছে, অন্যদিকে আবাসন খাতের মন্দা ও গ্রাহকদের খরচ করার প্রবণতা কমে যাওয়ায় দেশের বাজারে চাহিদা কমছে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে গাড়ি বিক্রি প্রায় ২৩ লাখ বা ২০ শতাংশ কমেছে। এই পরিমাণটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম গাড়ির বাজার জাপানের মোট নতুন গাড়ি নিবন্ধনের সমান। একই সময়ে চীনের গাড়ি রপ্তানি বেড়েছে ৭১ শতাংশ।
এইচএসবিসির বিশ্লেষক ইউকিয়ান ডিং মনে করেন, আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বর থেকে নতুন মডেলের গাড়ি বাজারে এলে বিক্রি কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। তবে খুব দ্রুত বাজার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম।
যেমন চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বিওয়াইডি ব্র্যান্ডের গাড়ির অভ্যন্তরীণ বিক্রি ৩৫ শতাংশ কমেছে। তবে তারা বিশ্ববাজারে রপ্তানি ৭৯ শতাংশ বাড়িয়ে এই ঘাটতি পুষিয়ে নিয়েছে। ২০২৬ সালে এসে ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্য তাদের অন্যতম বড় বাজারে পরিণত হয়েছে।
চীনের এই অগ্রগতি জাপানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ২০২৩ সাল থেকে চীন বিশ্বের শীর্ষ গাড়ি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। বিল রুশো বলেন, জাপানের উত্থান ঘটেছিল উৎপাদন দক্ষতা, গুণমান ও জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে। তবে চীনের শক্তি আরও বহুমুখী। তাদের শক্তির জায়গায় রয়েছে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি, ব্যাটারি, আধুনিক সফটওয়্যার এবং দ্রুত নতুন পণ্য বাজারে আনার ক্ষমতা। এর ফলে বিশ্ববাজারে চীনের এই বিস্তার আরও বেশি প্রভাব ফেলবে।