
নেপালে গতকাল বুধবার আকস্মিক ও ভয়াবহ যে ভূমিধস ও বন্যা হয়েছে, তাতে পাহাড় থেকে প্রবল কাদা ও পানির স্রোত অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো নেমে এসেছে। এমন প্রবল স্রোত আগে থেকে অনুমান করা কার্যত অসম্ভব। দৌড়ে পালিয়ে এর আঘাত থেকে প্রাণরক্ষা করাটাও বেশ কঠিন।
নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলটিতে এই ভূমিধস–বন্যার যথাযথ কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের জটিল ভূপ্রকৃতির কারণে এমন আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। গতকালের দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন ৮০০ বিদেশিসহ প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ।
সীমান্তের চীনা অংশের নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে দেখা যায়, কয়েক তলা উঁচু একটি ভবনের ওপর কাদা–পানি আর ধ্বংসাবশেষের প্রবল ঢল আছড়ে পড়ছে। মুহূর্তে ভবনটি তলিয়ে যায়। বাস–গাড়িগুলো খেলনার মতো ঢলে ভেসে যায়।
এই দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে ‘পৃথিবীর ছাদ’ হিসেবে পরিচিত হিমালয় অঞ্চলে বেশ কিছু পরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এসব পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের দুর্যোগের শঙ্কাও বেড়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধসের এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। ভূমিধসে সেখানকার একটি নদীর গতিপথ আটকে যায়। সেখানে প্রাকৃতিকভাবে বাঁধের মতো অবস্থা তৈরি হয়। পরে সেই ‘বাঁধ’ ভেঙে পানির প্রবল ঢল নিচের দিকে নেমে আসে।
তবে নতুন এক নোটে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, সেখানে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। এর জের ধরে ভূমিধস ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভূমিধসের জেরেই সেখানে ভূকম্পন ঘটেছিল।
ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধসের এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। ভূমিধসে সেখানকার একটি নদীর গতিপথ আটকে যায়। সেখানে প্রাকৃতিকভাবে বাঁধের মতো অবস্থা তৈরি হয়। পরে সেই ‘বাঁধ’ ভেঙে পানির প্রবল ঢল নিচের দিকে নেমে আসে।শিশির খানাল, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
কাঠমান্ডু–ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রাথমিক মূল্যায়নে সীমান্তের চীনা অংশে কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি।
আন্তসরকারি সংস্থাটির রিমোট সেন্সিং ও ভূবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের ধারণা, নেপাল অংশে একটি পাথুরে বরফধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে তীব্র বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।’
এ দুর্যোগের আগে ঘটনাস্থল ও আশপাশে খুব একটা বৃষ্টি হয়নি। এটা বেশ অবাক করার মতো—বলছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটি সান আন্তোনিওর জলবিজ্ঞানী হাতিম শরিফ। তিনি বলেন, ‘এটা বিশ্বের প্রায় সব ধরনের কার্যকর বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেওয়ার মতো ঘটনা।’
অনেকেই হয়তো দেখতে পেয়েছিলেন, কাদা–পানির প্রবল ঢল পাহাড় থেকে নেমে আসছে। কেউ কেউ হয়তো দৌড়ে নিরাপদ জায়গায় ছুটে যাওয়ার চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়েছে কি?
এ দুর্যোগের আগে ঘটনাস্থল ও আশপাশে খুব একটা বৃষ্টি হয়নি। এটা বেশ অবাক করার মতো।হাতিম শরিফ, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটি সান আন্তোনিওর জলবিজ্ঞানী।
হাতিম শরিফ বলেন, এ পরিস্থিতিতে মুহূর্তের মধ্যেই অনেক দেরি হয়ে যায়। দৌড়ে পালিয়ে কোনো লাভ হয় না। গাড়িতে করে পালানোর চেষ্টাও কাজে আসে না। কারণ, দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসা কাদা–পানির ঢল ভয়াবহ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। এটা অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো।
এমন মুহূর্তে দৌড়ে পাহাড়ে উঠতে পারাটা প্রাণরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। হাতিম শরিফের মতে, অন্তত ২০ ফুট উঁচুতে উঠে যেতে হবে।
যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডরোথি হাইনরিচ এএফপিকে বলেন, নেপালের এসব পাহাড়ি এলাকার অনেক জায়গায় নদীগুলো বেশ সংকীর্ণ। তুষারধস কিংবা ভূমিধস—যেকোনো কারণে নদীর গতিপথ আটকে গেলে প্রচুর পানি জমে যেতে পারে। পরে সেখান থেকে প্রবল ঢলের সৃষ্টি হতে পারে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, সেখানে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। এর জের ধরে ভূমিধস ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভূমিধসের জেরেই সেখানে ভূকম্পন ঘটেছিল।
দ্বিতীয় আরেকটি প্রবল ঢলের আশঙ্কা করছেন আইসিআইএমওডির জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং। তাঁর মতে, উজানে এখনো নদীর গতিপথ আটকে রয়েছে। এ কারণে আবারও প্রবল ঢল দেখা দিতে পারে।
হিমালয়ের হিমবাহের হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার (জিএলওএফ) ঝুঁকিতে রয়েছে নেপাল। হিমবাহের বরফ গলে সৃষ্টি হওয়া হ্রদের পানি আকস্মিকভাবে বিপুল পরিমাণে বেরিয়ে গেলে এ ধরনের ভয়াবহ বন্যা হয়।
এর আগে গত বছরের জুলাইয়ে একই রকমের একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। চীনের গিয়িরং কাউন্টি থেকে প্রবল ঢল নেমে নেপালের রসুয়া জেলায় আঘাত হানে। তবে গতকালের ঘটনায় জিএলওএফ দায়ী ছিল কি না, সেটা এখনো জানায়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
হাতিম শরিফ বলেন, এ পরিস্থিতিতে মুহূর্তের মধ্যেই অনেক দেরি হয়ে যায়। দৌড়ে পালিয়ে কোনো লাভ হয় না। গাড়িতে করে পালানোর চেষ্টাও কাজে আসে না। কারণ, দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসা কাদা–পানির ঢল ভয়াবহ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। এটা অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো।
আগামী কয়েক দিন কিংবা কয়েক সপ্তাহে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা নেপালের এই ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো যোগসূত্র আছে কি না—সেটা খতিয়ে দেখবেন। এ জন্য ‘অ্যাট্রিবিউশন স্টাডি’ নামে বিশেষ ধরনের গবেষণা করা হবে।
এ প্রক্রিয়ায় বর্তমান জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারজনিত উষ্ণ জলবায়ুতে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কতটা, তা বিশ্লেষণ করা হবে। একই সঙ্গে শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গেও তুলনা করে দেখা হবে।
ডরোথি হাইনরিচ বলেন, ‘হিমালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কেমন প্রভাব পড়ছে, তা আমরা জানি। তাপপ্রবাহ বাড়ছে। হিমবাহ সরে যাচ্ছে। স্থায়ীভাবে জমে থাকা বরফ গলছে। এসব কারণে ভূমিধস আর হিমবাহের হ্রদ থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার মতো দুর্যোগের ঘটনা ঘটতে পারে।’