
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে বাড়ছে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি। নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে তেমনই এক হিমবাহ ধস ও বন্যায় প্রাণ গেছে অন্তত ৩৫৯ জনের। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দুর্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনেরই ফল।
আজ বৃহস্পতিবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় এক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৮০০ বিদেশি। আগের দিন হিমবাহ ধসের ফলে মাটি ও পাথরের একটি বিশাল অংশ হিমালয়ের একটি নদীতে আছড়ে পড়ে। এর পরপরই উপত্যকা ও পাহাড়ি জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে যায় প্রলয়ংকরী বন্যা।
আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ডের ‘মাউন্টেনস টু সি’ কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।’ তিনি আরও জানান, এর ফলে হিমবাহ ধস এবং চলতি সপ্তাহের মতো একের পর এক দুর্যোগ বারবার ঘটছে।
বুধবারের এই বিপর্যয়ের মূল কারণ জানতে এখনো বিশ্লেষণ চলছে। তবে বিজ্ঞানীরা প্রাথমিকভাবে মনে করছেন, নেপালের ‘লাংটাং লিরুং’ চূড়ার উত্তর ঢালে একটি বিশাল হিমশিলা ধসে পড়ে। এরপর সেই ধস তিব্বত অংশের ‘লেন্দে খোলা’ নদীতে আছড়ে পড়লে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত।
প্রথম ধসের পর শুরু হয় ধারাবাহিক বিপর্যয়। এতে সীমান্তজুড়ে অন্তত ছয়টি বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে জিরং স্থলবন্দরের বাণিজ্যকেন্দ্রের অবকাঠামো। শুধু তা-ই নয়, ভারত সীমান্তের কাছাকাছি ভাটির ১০০ কিলোমিটারের বেশি এলাকার নদীর গতিপথকে এটি প্রভাবিত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুধবারের এই ধসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনই একমাত্র ও তাৎক্ষণিক কারণ নয়। তবে তাঁরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও হিমবাহ গলে যাওয়া বড় ভূমিকা রেখেছে।
সাইমন কক্স আরও বলেন, তাপমাত্রা বাড়লে খাড়া ঢালে বরফের বাঁধন দুর্বল হয়ে যায়। একই সঙ্গে বাড়ে গলিত বরফের পানির প্রবাহ। এ ছাড়া বরফ জমাট বাঁধা ও গলে যাওয়ার চক্র এবং বৃষ্টির ধরনেও পরিবর্তন আসে। এসব কারণে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কিছু জায়গায় ধসের ঘটনা আরও বাড়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলে বারবার এমন বিপর্যয় আঘাত হেনেছে, তবে সেগুলোর মাত্রা ছিল তুলনামূলক ছোট। এর মধ্যে রয়েছে তিব্বত-নেপাল সীমান্তের জিরংয়ে ২০২৫ সালের বন্যা, ২০২৪ সালে শেরপাদের থামে গ্রামে হিমবাহের হ্রদ বিস্ফোরণ এবং এর আগে ২০২৩ সালে ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিমে ঘটে যাওয়া দুর্যোগ।
পুরো হিন্দুকুশ পর্বতমালায় বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। এসব দুর্যোগের তীব্রতাও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। নেপালভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্ট (ইসিমোড) জানিয়েছে, পানি, ভূমি ও আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন এই অঞ্চলের মানুষকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
ইসিমোডের জ্যেষ্ঠ ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ ফারুক আজম বলেন, পাহাড়ে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় পৃথিবীর বরফাবৃত অংশ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি মনে করেন, অতিরিক্ত তুষার গলে যাওয়ার পাশাপাশি ভূকম্পনের কারণে সম্ভবত হিমশিলার এই প্রাথমিক ধস নেমেছিল। আর তা থেকেই বুধবার ভাটিতে একের পর এক আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।
হিমালয়ের দীর্ঘমেয়াদি চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের এক তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়গুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। সংস্থাটি তখন আরও জানিয়েছিল, নেপালের হিমবাহগুলো পূর্ববর্তী দশকের তুলনায় বিগত দশকে ৬৫ শতাংশ হারে দ্রুতগতিতে গলেছে।
হংকংয়ের সিটি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের ডিন বেঞ্জামিন হর্টন বলেন, বুধবারের এই দুর্যোগ অনেকগুলো ঘটনার প্রভাবে সংঘটিত ঘটনার একটি বড় উদাহরণ।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে হর্টন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ ক্ষয়, বরফ জমা মাটি গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি ঢালের ভারসাম্য দুর্বল হওয়ার সঙ্গে যখন ভূমিকম্প যুক্ত হয়, তখন এমনটা ঘটে। এর ফলে একক কোনো কারণে ঘটা ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি জটিল ও ধ্বংসাত্মক হয়।
হর্টন আরও জোর দিয়ে বলেন, উচ্চ পাহাড়ি অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এ ধরনের ধারাবাহিক ঝুঁকির ধরন বোঝা অত্যন্ত জরুরি।