
গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে জাপানের ‘দ্য হোক্কাইদো শিম্বুন প্রেস’-এর এক জাপানি সংবাদদাতাকে আটকের কথা জানিয়েছে রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি)। রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, তিনি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা-সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। জাপান সরকার এ ঘটনায় মস্কোর কাছে অবিলম্বে তথ্য চেয়েছে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তির প্রতি মানবিক আচরণের দাবি জানিয়েছে।
এফএসবির বরাত দিয়ে জাপানের গণসম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকেসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যম বুধবার জানায়, রুশ দূরপ্রাচ্যের শাখালিন অঞ্চলের ইউঝনো-শাখালিনস্ক ব্যুরোতে কর্মরত ওই জাপানি সাংবাদিককে রাশিয়া ছাড়ার ঠিক আগে আটক করা হয়। পরে তাঁকে মস্কোয় নেওয়া হয়। রুশ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জাপানের একটি গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশে রাশিয়ার নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছিলেন।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এফএসবি কর্মকর্তাদের অভিযান নিয়ে একটি প্রতিবেদন সম্প্রচার করেছে। তাতে আটক ব্যক্তিকে হেফাজতে নেওয়া এবং পরে মস্কোর আদালতে হাজির করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। রুশ সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আদালত তাঁকে প্রায় দুই মাস আটক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, এই আটকাদেশ ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
রুশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এফএসবির এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইউক্রেনে হামলার জন্য সরকারিভাবে তলব করা এবং স্বেচ্ছায় যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে দ্বীপের বাসিন্দাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন ওই জাপানি সাংবাদিক। যাঁদের কাছ থেকে তিনি তথ্য নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং জাপানের দাবি করা চারটি দ্বীপের বাসিন্দারাও আছেন। জাপানে এই দ্বীপগুলো ‘উত্তর ভূখণ্ড’ নামে পরিচিত। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংগৃহীত তথ্য জাপানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল ওই সাংবাদিকের।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেন, বিদেশি সাংবাদিক হিসেবে নিবন্ধিত নিজেদের প্রতিনিধিকে ব্যবহার করে রাশিয়ার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার লক্ষ্যে টোকিওর তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা ‘দুঃখজনক’।
মস্কোয় জাপানি দূতাবাস এবং ইউঝনো-শাখালিনস্কে জাপানের কনস্যুলেট জেনারেল রুশ কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত তথ্য ও যোগাযোগের সুযোগ চেয়েছে।
জাপানের চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি কিহারা মিনোরু বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, সরকার এখনো আটক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। পরিস্থিতি স্পষ্ট করতে এবং জাপানি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টোকিও প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।
কিহারা আরও বলেন, জাতীয় স্বার্থে যা প্রয়োজন, তা বিবেচনায় নিয়েই সরকার বিষয়টি মোকাবিলা করবে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বুধবার রাতে এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়, ১৪ অক্টোবর জাপানে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাই নোজদ্রেভকে তলব করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইউরোপীয় বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক নাকামুরা কিমিতাকে।
বৈঠকে নাকামুরা শাখালিনে জাপানি নাগরিককে আটকের বিষয়ে দ্রুত তথ্য দেওয়ার অনুরোধ জানান। আটক নাগরিকের সঙ্গে মানবিক, ন্যায্য ও নিরপেক্ষ আচরণের জোরালো আহ্বানও জানান তিনি।
জাপান সরকার এখন পর্যন্ত আটক নাগরিক সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা পায়নি। অথচ রুশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটক করেছে এবং এ নিয়ে একতরফাভাবে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছে। এর তীব্র প্রতিবাদ জানান নাকামুরা। আটক নাগরিকের সঙ্গে জাপান সরকারের যোগাযোগের সুযোগ অবিলম্বে নিশ্চিত করারও অনুরোধ জানান তিনি। জবাবে রাষ্ট্রদূত নোজদ্রেভ বলেন, জাপান সরকারের অবস্থান তিনি নিজ সরকারকে জানাবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, একই বৈঠকে এতোরোফু দ্বীপে চীনা প্রতিনিধিদের সফর নিয়েও প্রতিবাদ জানান নাকামুরা। শাখালিন ওব্লাস্ট সরকার ১৩ অক্টোবর চীনের হেইলংজিয়াং প্রদেশের সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের এ সফরের ঘোষণা দেয়।
জাপান সরকারের অবস্থান হলো, এতোরোফুসহ ‘উত্তর ভূখণ্ড’ ঐতিহাসিকভাবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জাপানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। টোকিও বলছে, তৃতীয় কোনো দেশের সরকারি বা ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের এমন কার্যক্রম মেনে নেওয়া যায় না, যা ওই অঞ্চলকে রাশিয়ার ভূখণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে। নাকামুরা এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে রুশ কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান। জবাবে রাষ্ট্রদূত নোজদ্রেভ রাশিয়ার অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। নাকামুরা জাপানের অবস্থান তুলে ধরে তা স্পষ্টভাবে খণ্ডন করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিদেশে জাপানি নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উত্তর ভূখণ্ড সমস্যার সমাধানে জাপান সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চারটি দ্বীপ নিয়ে জাপান ও রাশিয়ার মধ্যকার বিরোধের সুরাহা হয়নি। জাপানে দ্বীপগুলোকে ‘উত্তর ভূখণ্ড’ বলা হয়। আর রাশিয়া এগুলোকে কুড়িল দ্বীপপুঞ্জের অংশ হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করে। এই বিরোধের কারণেই দুই দেশ এখনো আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি সই করতে পারেনি।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপর জাপানের নিষেধাজ্ঞা এবং মস্কো-নিয়ন্ত্রিত বিতর্কিত দ্বীপগুলো নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধে দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে। গত আগস্টে উত্তর ভূখণ্ডের অন্যতম দ্বীপ এতোরোফুতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সফর দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে আরও চাপ বাড়িয়েছে।