কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া

প্রবাসীদের জন্য কড়া নিয়ম করতে যাচ্ছে মালয়েশিয়া

ভারত থেকে মালয়েশিয়ায় আসা ব্যবসায়িক পরামর্শক সঞ্জিত কিছুদিন আগপর্যন্ত দেশটিকে নিজের ঘরবাড়ি বলেই মনে করতেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে বসবাস ও কাজ করার সুবাদে তিনি এখানকার আবহাওয়া, মানুষ ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলেন।

চল্লিশোর্ধ্ব সঞ্জিত (ছদ্মনাম) আল-জাজিরাকে বলেন, ‘পাঁচ বছর পার করার পর মালয়েশিয়াকে দীর্ঘদিন বসবাসের জন্য আমার কাছে আদর্শ মনে হয়েছিল। দেশটির সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে মানুষ সহজেই অভ্যস্ত হয়ে যায়।’

কিন্তু বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরতা কমাতে মালয়েশিয়া সরকারের সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তে সঞ্জিত ও তাঁর মতো হাজার হাজার মানুষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখন বেশ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

আগামী জুন মাস থেকে বিদেশি কর্মীরা ভিসা পেতে চাইলে আগের তুলনায় অনেক বেশি বেতন দেখাতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে এই ন্যূনতম বেতনের সীমা প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তারা কত দিন পর্যন্ত একই ভিসাধারীকে স্পনসর করতে পারবেন, তার ওপরও সময়সীমা বেঁধে দিচ্ছে সরকার।

আগামী জুন মাস থেকে বিদেশি কর্মীদের ভিসা পাওয়ার জন্য সর্বনিম্ন বেতনের সীমা প্রায় দ্বিগুণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তারা কত দিন পর্যন্ত একই ভিসাধারীকে স্পনসর করতে পারবেন, তার ওপরও সময়সীমা বেঁধে দিচ্ছে সরকার।

সঞ্জিত বলেন, ‘অবাক করা বিষয় হলো, কোনো আগাম আভাস ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত এসেছে। এতে বাড়ি বা গাড়ি কেনার মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এখন সন্দেহের অবকাশ তৈরি হয়েছে।’

১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় অর্থনীতি হিসেবে মালয়েশিয়ার রূপান্তর ঘটে। কয়েক দশক ধরে দেশটি বিদেশি শ্রমিকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
মালয়েশিয়ার ২১ লাখ নিবন্ধিত বিদেশি শ্রমিকের একটি বড় অংশ কায়িক পরিশ্রমের কাজ করেন। তাঁদের মাসিক গড় বেতন ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত বা ৪৩০ ডলারের কাছাকাছি।

এর বাইরে একটি ক্ষুদ্র অংশ অর্থায়ন, সেমিকন্ডাক্টর এবং তেল ও গ্যাস খাতের মতো উচ্চ বেতনের বিশেষায়িত খাতে কাজ করেন।

২০২৪ সালে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুতিওন জানান, দেশটিতে উচ্চ বেতনের অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার। তাঁরা দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি রিঙ্গিত (১ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার) জোগান দিচ্ছেন। এ ছাড়া কর বাবদ সরকারকে দিচ্ছেন প্রায় ১০ কোটি রিঙ্গিত বা ২ কোটি ৫০০ কোটি ডলার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের দেশ মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমবাজার নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় নীতিকৌশলে সরকার সতর্ক করে বলেছে, কম দক্ষ বিদেশি শ্রমিকদের ওপর ‘ক্রমাগত নির্ভরতা’ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করছে।

মালয়েশিয়ার আবাসন খাতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকেরা

থার্টিনথ মালয়েশিয়া প্ল্যান পরিকল্পনাকারী বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘বিষয়টি শ্রমবাজারে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে কম দক্ষ ও কম মজুরির কাজের আধিপত্য, মজুরির বৈষম্য এবং উৎপাদনশীলতার ধীরগতির মতো সমস্যা তৈরি হয়েছে।’
মালয়েশিয়ায় গড় মাসিক মজুরি প্রায় ৭০০ ডলার। স্থানীয়দের নিয়োগে উৎসাহিত করতে এবং মানুষের আয় বৃদ্ধি করতে সরকার ২০২৪ সালে কর্মক্ষেত্রে বিদেশিদের অনুপাত ১৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে।

‘আমি শুনেছি, কিছু প্রবাসী বাধ্য হলে অন্য দেশে চলে যাওয়ার বিকল্প নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন। তবে অনেকেই এখান থেকে যেতে অনিচ্ছুক।’
ছাত্রাবস্থায় মালয়েশিয়ায় আসা এক ব্যক্তি

গত জানুয়ারিতে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিভার বিকাশে উচ্চ বেতনের প্রবাসীদের ক্ষেত্রেও বিদেশি কর্মীদের জন্য কঠোর নিয়ম কার্যকর করা হবে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, তিন শ্রেণির কাজের পারমিটের ক্ষেত্রে মাসিক প্রারম্ভিক সর্বনিম্ন বেতন যথাক্রমে ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার রিঙ্গিত (২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ডলার), ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার রিঙ্গিত (১ হাজার ২৬০ থেকে ২ হাজার ৫২০ ডলার) এবং ৩ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার রিঙ্গিত (৭৬০ থেকে ১ হাজার ২৬০ ডলার) করা হচ্ছে।

তা ছাড়া ভিসার ক্যাটাগরির ওপর ভিত্তি করে নিয়োগকর্তারা প্রত্যেক বিদেশি কর্মীকে মাত্র ৫ বা ১০ বছরের জন্য স্পনসর করার অনুমতি পাবেন। বিদেশি কর্মীদের অবস্থানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে নিয়োগকর্তাদের পরিকল্পনা রাখতে হবে।

কর্মকর্তারা বলছেন, এই নীতির উদ্দেশ্য প্রবাসীদের প্রবেশ সীমিত করা নয়; বরং তাঁদের কর্মসংস্থান যেন স্থানীয় প্রতিভার বিকাশে প্রকৃত অর্থেই পরিপূরক হয় এবং ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করে, তা নিশ্চিত করা।

২০২২ সালের শেষ দিক থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মরত যুক্তরাজ্যের নাগরিক টমাস মিড বলেন, সরকারের এ পরিকল্পনা কিছু প্রবাসীকে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।

২৮ বছর বয়সী সম্পদ ব্যবস্থাপক মিড আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এখানে সব সময়ই নিয়ম ছিল, যার মধ্যে সর্বনিম্ন বেতনের শর্তও রয়েছে। তবে ১০ হাজার রিঙ্গিত থেকে সরাসরি ২০ হাজার রিঙ্গিতে লাফ দেওয়াটা বেশ বড় একটি ধাক্কা।’

ছাত্রাবস্থায় মালয়েশিয়ার সংস্কৃতি ও খাবারের প্রেমে পড়ে মিড কাজের জন্য এ দেশে ফিরে আসেন। সম্প্রতি তিনি স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে কুয়ালালামপুরে একটি সম্পত্তিও কিনেছেন।

মিড বলেন, ‘আমি শুনেছি, কিছু প্রবাসী বাধ্য হলে অন্য দেশে চলে যাওয়ার বিকল্প নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন। তবে অনেকেই এখান থেকে যেতে অনিচ্ছুক।’

ডগলাস গান সিঙ্গাপুরের নাগরিক, যিনি মালয়েশিয়ায় একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেন, এসব পরিবর্তনের কারণে এমন কোম্পানিগুলোর খরচ বেড়ে যাবে, যারা আগে মালয়েশিয়ার কম খরচের কারণে আকৃষ্ট হয়েছিল।

ডগলাস গান বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান কম বেতনের সীমার অধীনে বর্তমানে ভিসা পাওয়ার যোগ্য বিদেশি প্রতিভা নিয়োগ করছে, তাদের জন্য নতুন নিয়ম চ্যালেঞ্জিং হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি চীনের দ্বিতীয় স্তরের শহরগুলো থেকে আসা প্রকৌশলীদের কথা উল্লেখ করেন।

ডগলাস গান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘বেতন বেড়ে ১০ হাজার রিঙ্গিত হলে কোম্পানিগুলো অবশ্যই তাঁদের এখানে আনবে না।’

ডগলাস গান বলেন, তিনি বিদেশি শ্রমিকের শর্ত কঠোর করার বিরোধী নন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার ঢালাওভাবে নিয়ম করার বদলে বিভিন্ন শিল্পের ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করবে।

ডগলাস গান বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় বিদ্যমান ব্যবসার জন্য আমরা ইতিমধ্যে “ধীরে চলো ও পরিস্থিতি দেখো” নীতি অবলম্বন করছি।’

লিওনার্দো ইন্দোনেশিয়ান একজন নাগরিক। তিনি মালয়েশিয়ার কম্পিউটার গেম সেক্টরে কাজ করেন। তিনি বলেন, এ পরিবর্তনের ফলে তাঁর কর্মসংস্থানের পাসের ক্যাটাগরি দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় স্তরে নেমে যাবে।

লিওনার্দো মালয়েশিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের এবং অবশেষে তাঁর মাকে এ দেশে নিয়ে আসার আশা করেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি ভাবছেন, তা আদৌ সম্ভব হবে কি না।
লিওনার্দো বলেন, ‘আমার মা ইন্দোনেশিয়ায় একা থাকেন। আমি ভেবেছিলাম, যদি এখানে স্থায়ী হতে পারি, তবে তাঁকে নিয়ে আসতে পারব।’

কুয়ালালামপুরের কেনাঙ্গা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের অর্থনৈতিক গবেষণা বিভাগের প্রধান ওয়ান সুহাইমি বলেন, প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাওয়া গেলেই কেবল প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয়দের নিয়োগ করতে পারবে।

ওয়ান সুহাইমি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি অর্জন প্রবাসীদের আটকে রাখার ওপর যতটা না নির্ভর করছে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে মালয়েশিয়া আসলে সেই দক্ষতা সরবরাহ করতে পারবে কি না, তার ওপর।’

ওয়ান সুহাইমি বলেন, বেতনের সীমা দ্বিগুণ করাটা একটি ধাক্কা। দ্বিতীয় স্তরের কর্মসংস্থান পাসের অধীনে থাকা বিদেশি কর্মীরা খুব উচ্চাভিলাষী নিয়োগ নয়; বরং তাঁরা হলেন মূল ব্যবস্থাপক, প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞ।

ওয়ান সুহাইমি বলেন, ‘মেয়াদ বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি দক্ষতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে। তবে তা তখনই সম্ভব, যখন এসব পরিকল্পনা কেবল কাগজে-কলমে না থেকে বাস্তবসম্মত হবে।’

স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভাইজরি ফার্ম এফএসজি অ্যাডভাইজরির প্রধান নির্বাহী অ্যান্থনি দাস বলেন, নতুন এই নীতি মধ্যম স্তরের প্রবাসী শ্রমের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।

অ্যান্থনি দাস বলেন, মালয়েশীয়রা কীভাবে উপকৃত হবে, তা নির্ভর করবে স্থানীয় কর্মিবাহিনী গড়ে তোলার নীতি কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপর।

এফএসজি অ্যাডভাইজরির প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘এমন পদক্ষেপ স্থানীয় প্রতিভাকে এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিল্পের মানোন্নয়নে পরিপূরক সংস্কারগুলোর ওপরই এর চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে।’

মালয়েশিয়ার এক নাগরিককে বিয়ে করা ৩৩ বছর বয়সী যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ব্যবস্থাপক জোশুয়া ওয়েবলি বলেন, তিনি মালয়েশিয়ার চাকরিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেন। তিনি মনে করেন, এসব পরিবর্তন সঠিক দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের থামাতে পারবে না।

ওয়েবলি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘কেউ যদি মালয়েশিয়ায় আসতে চান, তবে তাঁকে যথেষ্ট দক্ষ হতে হবে। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের বসবাসের জন্য মালয়েশিয়া এখনো একটি উজ্জ্বল গন্তব্য।’

সঞ্জিতের মতো অন্যরা অবশ্য অতটা আশাবাদী নন। তিনি বলেন, ‘সুস্পষ্ট কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই যদি মালয়েশিয়া এসব নীতি কার্যকর করে, তাহলে আমার মতো মানুষ ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের মতো বিকল্প দেশগুলো খুঁজবে। ওই সব দেশে প্রবাসীদের জন্য অনুকূল নীতিমালা রয়েছে।’