ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫–এ পৌঁছেছে
ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫–এ পৌঁছেছে

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রে ব্যয় রেকর্ড বেড়েছে: গবেষণা

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ব্যয় গত বছর রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো তাদের মজুতাগার থেকে আরও বেশি ওয়ারহেড (ক্ষেপণাস্ত্রসহ অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র) সক্রিয় উৎক্ষেপণব্যবস্থায় স্থানান্তর করেছে। বিশেষজ্ঞরা আজ মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন।

পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপে কাজ করা আন্তর্জাতিক জোট ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার ওয়েপনস (আইক্যান) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, গত বছর পারমাণবিক অস্ত্রধারী ৯টি দেশ সম্মিলিতভাবে তাদের অস্ত্রাগারের পেছনে প্রায় ১১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি।

আইক্যানের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, ‘আমরা এখন নতুন একটি পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দ্বারপ্রান্তে আছি।’

আমরা এখন নতুন একটি পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দ্বারপ্রান্তে আছি।

গতকাল সোমবার স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) পৃথক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্যাপক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে পারমাণবিক ঝুঁকি বাড়ছে। একই উদ্বেগ জানিয়েছে আইক্যানও।

উভয় গবেষণায় বলা হয়, বিভিন্ন দেশ তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আধুনিক করছে এবং আরও বেশি অস্ত্র মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ কারণেই ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।

আইক্যানের কর্মসূচি পরিচালক ও সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদনের সহলেখক সুসি স্নাইডার বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের এ সম্প্রসারণ উদ্বেগজনক। এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে গেলে, আমি আতঙ্কিত।’

ঝুঁকি ও উত্থান

সিপ্রির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা কয়েক দশক ধরে কমছে। চলতি বছরের শুরুতে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১৮৭–তে। তবে একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫–এ পৌঁছেছে।

সিপ্রির পরিচালক করিম হাগাগ এএফপিকে বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা কমলেও পারমাণবিক বিপদ ও ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে।’ তিনি বলেন, কৌশলগত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়া ও পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা উদ্বেগের বড় কারণ।

সিপ্রির পূর্বাভাস, আগামী বছরগুলোয় বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আবারও বাড়তে পারে। কারণ, পুরোনো অস্ত্র ধ্বংস করার গতি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের গতি বাড়ছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশ তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আধুনিক করছে এবং আরও বেশি অস্ত্র মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ কারণেই ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।

বর্তমানে বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের প্রায় ৮৩ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে। দুই দেশের কাছে ৫ হাজারের বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড আছে।

সিপ্রির হিসাব অনুযায়ী, চীন অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার সম্প্রসারণ করছে। বর্তমানে দেশটির কাছে প্রায় ৬২০টি ওয়ারহেড রয়েছে।

করিম হাগাগ বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চীনকে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হতে উৎসাহিত করছে।’

আইক্যানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের পাশাপাশি ব্রিটেন, ফ্রান্স, ভারত, ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তান—সব পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ তাদের অস্ত্রভান্ডারে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের এ সম্প্রসারণ উদ্বেগজনক। এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে গেলে, আমি আতঙ্কিত।
সুসি স্নাইডার, আইক্যানের কর্মসূচি পরিচালক

গত বছর এ ৯টি দেশ সম্মিলিতভাবে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বেশি ব্যয় করেছে। সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

আইক্যানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে ৬ হাজার ৯২০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ হাজার ২৪০ কোটি ডলার বেশি।

ব্যয়ের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পরই রয়েছে চীন। দেশটি গত বছর প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এরপর রয়েছে ব্রিটেন, যার ব্যয় ১ হাজার ২৬০ কোটি ডলার। রাশিয়া ব্যয় করেছে প্রায় ৯৫০ কোটি ডলার।

গত পাঁচ বছরে এ ৯টি দেশ সম্মিলিতভাবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের পেছনে ৪৭ হাজার কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও বাড়বে।

বিশ্বের মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা কয়েক দশক ধরে কমছে। চলতি বছরের শুরুতে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১৮৭–তে। তবে একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫–এ পৌঁছেছে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকে তাকিয়ে আইক্যান বলেছে, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র আগামী শতাব্দীতেও পারমাণবিক অস্ত্রব্যবস্থা উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে। অন্য দেশগুলোও দীর্ঘস্থায়ী নতুন অস্ত্রব্যবস্থা চালু করছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত নতুন ‘সেন্টিনেল’ আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ২১০০ সালের পরও সক্রিয় থাকতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির প্লুটোনিয়াম উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, বর্তমান ওয়ারহেডগুলো ২১২০ সাল পর্যন্ত কার্যকর রাখা সম্ভব হবে। এ জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে।

গবেষকদের ধারণা, শুধু ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র খাতে ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

গবেষকেরা বলছেন, এমন এক সময়ে এ বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, যখন বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম তহবিল সংকটে ভুগছে। তাঁদের হিসাবে, গত বছর পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে এক দিনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে ২০ লাখের বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল।

সুসি স্নাইডার বলেন, নিজেদের জনগণের জন্য সহায়তা বা স্বাস্থ্যসেবায় অর্থ ব্যয় না করে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো এমন অস্ত্রভান্ডারে বিনিয়োগ করছে, যা ব্যবহার করলে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হবে—এ কথা তারাও জানে।