বোমাবর্ষণে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর চুগুয়েভ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলায় নিহত এক ব্যক্তির লাশ চাদর দিয়ে ঢেকে দিচ্ছেন প্রতিবেশী। রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর গতকাল দেশটির বিভিন্ন এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটে
বোমাবর্ষণে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর চুগুয়েভ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলায় নিহত এক ব্যক্তির লাশ চাদর দিয়ে ঢেকে দিচ্ছেন প্রতিবেশী। রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর গতকাল দেশটির বিভিন্ন এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটে

সংকটে ইউরোপ

তিন দিক থেকে ইউক্রেনে রুশ হামলা

প্রধান শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও কামানের গোলা নিক্ষেপ। কয়েকটি শহরে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন ইউক্রেনের সেনারা।

কারও আহ্বানে সাড়া দিলেন না রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। কয়েক সপ্তাহ ধরে সীমান্তে দুই লাখের মতো সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে ইউক্রেনে হামলা চালালেন তিনি। স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে স্থল, আকাশ ও সাগর থেকে ইউক্রেনে হামলা শুরু করেন রাশিয়ার সেনারা। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের কোনো দেশ আরেক দেশে সর্বাত্মক হামলা চালাল।

রাশিয়ার প্রথম দিনের হামলায় ইউক্রেনের ৪০ সেনাসহ অন্তত ৫০ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। অপর দিকে রাশিয়ার ৫০ সেনাকে হত্যা, পাঁচটি ট্যাংক ধ্বংস এবং ছয়টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী।

রাশিয়ার সেনারা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পাশাপাশি কামানের গোলা ছুড়েছেন। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ ১২টি শহরে বিস্ফোরণ ঘটেছে। কিয়েভে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা সদর দপ্তর আক্রান্ত হয়েছে। দেশটির ৭৪টি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করেছে রাশিয়ার সেনাবাহিনী। তারা গতকালই কিয়েভের উপকণ্ঠের আন্তোনোভ বিমানবন্দর দখলে নিয়েছে। নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বেলারুশ সীমান্তবর্তী চেরনোবিল পরমাণুকেন্দ্রের।

এদিকে পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চলে রুশ বাহিনীর সঙ্গে ইউক্রেনের সেনাদের তুমুল লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বন্দরনগরী ওডেসা ও মৌরিপোল এবং উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ শহরেও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন ইউক্রেনের সেনারা।

গতকাল ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ। শহরজুড়ে সতর্কতামূলক সাইরেনের শব্দ ভেসে আসে। আতঙ্কিত মানুষ শহর ছেড়ে পালাতে থাকায় মহাসড়কে তৈরি হয় যানজট। ইউক্রেনের আরেক শহর রাশিয়ার সীমান্তবর্তী খারকিভের একজন বাসিন্দা বলেন, একের পর এক বিস্ফোরণে ঘরের জানালাগুলো কেঁপে উঠেছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনকে ধ্বংস করতে চান। ইউক্রেনকে রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ চেয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা বলেছেন, এটা আগ্রাসন। বিশ্বকে অবশ্যই পুতিনকে থামানো উচিত। এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।

এ হামলাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে অন্ধকারতম সময়ের একটি বলে আখ্যায়িত করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল। এটা ইউরোপের জন্য বিপর্যয় নিয়ে আসবে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যুদ্ধ বন্ধের জন্য রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

যেভাবে হামলা

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন গতকাল ভোরে এক টেলিভিশন ভাষণে শুধু পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তিন দিন আগে সোমবার এ অঞ্চলের দুই এলাকা দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রাশিয়ার সেনাবাহিনী আক্রমণ চালিয়েছে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব দিক থেকে। বেলারুশ থেকেও হামলা হয়েছে। সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে ইউক্রেনের উত্তর সীমান্ত–সংলগ্ন বেলারুশে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন রুশ সেনারা।

রুশ সেনারা ঢুকেছেন উত্তর ইউক্রেনের চেরনিহিভ এবং পূর্ব ইউক্রেনের খারকিভ ও লুহানস্ক অঞ্চল দিয়ে। আক্রমণ চালানো হয়েছে কৃষ্ণসাগরের উপকূলবর্তী দক্ষিণের বন্দরনগরী ওডেসা এবং আজভ সাগর উপকূলবর্তী দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মৌরিপোল শহরে। এ ছাড়া উত্তর–পশ্চিম ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী বেলারুশ থেকেও রাশিয়ার সেনারা আক্রমণ চালিয়েছেন।

পুতিন ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার তিন ঘণ্টা পর রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ইউক্রেনের বিমানঘাঁটিগুলোর সামরিক কাঠামো এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে কিয়েভ ও উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভে সামরিক কমান্ড কেন্দ্রগুলোতে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর আসে।

বিরোধ যেখানে

৪ কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যার ইউক্রেন ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। দেশটির রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রিপাবলিক হিসেবে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের রয়েছে গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ। দেশটিতে অনেক রুশ ভাষাভাষীর মানুষ রয়েছে।

২০১৪ সালে ইউক্রেনে বিক্ষোভের মুখে রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচের পতন ঘটে। সে সময় পূর্ব ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করে নেয় রাশিয়া। এরপর ইউক্রেনের নতুন সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটে যোগ দিতে চায়। তাতে আপত্তি জানান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বিষয়টি নিয়ে কয়েক বছরের টানাপোড়েনের পর এখন দেশটিতে রাশিয়া হামলা চালাল।

ভোররাতে টেলিভিশন ভাষণে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে পুতিন বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার নাগরিকসহ সাধারণ মানুষকে গণহত্যার হাত থেকে রক্ষায় একটি বিশেষ সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোরও অভিযোগ করেন তিনি। পুতিন বলেন, ইউক্রেনকে নিরস্ত্র করা হবে। দমন করা হবে নাৎসিবাদ। রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, অধুনা ইউক্রেনের সীমান্ত থেকে ধারাবাহিক হুমকির ঘটনায় রাশিয়া নিরাপদ বোধ করতে পারে না।

ন্যাটো যা বলছে

অবশ্য ইউক্রেনের জনগণ বিনা উসকানিতে অন্যায় হামলার শিকার হয়েছেন বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি বলেছেন, তাঁদের (ইউক্রেনবাসী) জন্য তাঁর প্রার্থনা থাকছে। এ আগ্রাসনের জবাবে রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, এ বিষয়ে দ্রুত অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েন করা হবে না বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। তিনি বলেছেন, পুতিন পূর্বপরিকল্পিত যুদ্ধ বেছে নিয়েছেন। এটা বিপুলসংখ্যক প্রাণ ক্ষয় এবং মানুষের দুর্ভোগ বয়ে আনবে। বাইডেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে টেলিফোনে বলেন, এ হামলায় যে মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি হবে, তার দায় শুধু রাশিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র ও অংশীদারেরা সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর প্রধান জেনস স্টলটেনবার্গ রাশিয়ার প্রতি অবিলম্বে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, রাশিয়া ইতিহাস বদলে দিতে শক্তি প্রয়োগ করছে। ন্যাটোর মূল কাজ হলো সব মিত্রের সুরক্ষা দেওয়া। একজনের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ। ন্যাটোর প্রধান জানান, এ জোটের নীতিনির্ধারণী পর্ষদ নর্থ আটলান্টিক কাউন্সিল অন্যান্য দেশকে রক্ষার যে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা রয়েছে, সেটা সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ যেখানে প্রয়োজন হবে, সেখানে ন্যাটো সেনা মোতায়েন করা হবে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ রাশিয়ার এ হামলাকে ইউরোপের ইতিহাসে বাঁকবদলের অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গতকাল জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, ফ্রান্স ইউক্রেনের পক্ষে থাকবে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, পুতিন রক্তপাত ও ধ্বংসের পথ বেছে নিয়েছেন। এ হামলা ইউরোপের জন্য বিপর্যয় নিয়ে আসবে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য গতকাল রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর আওতায় এ দুই দেশে থাকা রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর সম্পদ জব্দ করা হচ্ছে।

তিন সপ্তাহ আগে রাশিয়ার সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করা চীন আবারও সব পক্ষের প্রতি সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়ার পদক্ষেপকে আক্রমণ হিসেবে বর্ণনার বিরোধিতা করেছে দেশটি।

যুদ্ধ ও রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাত ও নিত্যপণ্যের বাজারে। মহামারির ধকল কাটিয়ে উঠতে থাকা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য তা নতুন হুমকি তৈরি করেছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের বন্ড ও পুঁজিবাজারের পতন হচ্ছে, বাড়ছে ডলার ও সোনার দাম। ২০১৪ সালের পর প্রথমবারের মতো অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।

বোমা আতঙ্ক

পূর্ব ইউক্রেনের খারকিভের বাসিন্দা ভিক্টোরিয়া ভোলা জানান, ভোর পাঁচটায় বোমার শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙেছে। ওই সময়ের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশীরা আমার দরজায় এসে বলেন, এখনই পালাতে হবে।’ রাজধানী কিয়েভের বাসিন্দা তেতিয়ানা কাশতানোভাও একই বিবরণ দেন। তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণের শব্দে ভোর পাঁচটায় আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। এর মধ্য দিয়ে আজকে আমাদের দিন শুরু হয়েছে।’ এরপর একটি ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কের জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নেন তেতিয়ানা। তিনি বলেন, এখন দেশ ছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমে যাওয়ার সুযোগ পেলে তাঁরা সেটাই করতেন।

কিয়েভে টাকা তুলতে এবং খাবার ও পানির দোকানে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। মানুষ পোল্যান্ড সীমান্তের দিকে ছুটতে থাকায় সেখানে যানজট তৈরি হয়। যুদ্ধ থেকে বাঁচতে পালাতে থাকা লাখ লাখ মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো। সকালেই ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লিভ-অভিমুখী চার লেনের প্রধান সড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। কয়েক কিলোমিটারজুড়ে দেখা যায় গাড়ির সারি।

সেখানে যানজটে আটকা পড়েছিলেন তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে পালাতে থাকা ওক্সানা। তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তাই পালিয়ে যাচ্ছেন। ওক্সানা বলেন, ‘পুতিন আমাদের আক্রমণ করেছেন। আমরা বোমা হামলার ভয়ে আছি। তাঁদের বলুন, আপনারা এটা করতে পারেন না। এটা খুবই ভয়ানক।’