দেশে আসতে চেয়েছিলেন ইউক্রেনে থাকা হাসিনুল, বেধে গেল যুদ্ধ

কিয়েভে প্রায় ৩০ বছর ধরে আছেন বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গার হাসিনুল হক
ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেনের স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার রাত প্রায় তিনটা পর্যন্ত টেলিভিশন দেখেছেন হাসিনুল হক। দেশ-বিদেশের খবরাখবর রাখার অভ্যাস তাঁর। আজ সকাল সাতটার মধ্যেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন। বাংলাদেশি হাসিনুল থাকেন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের নিভকি এলাকায়। দেশটিতে আছেন প্রায় ৩০ বছর ধরে।

গতকাল ভোরে রুশ বাহিনী ইউক্রেনে হামলা চালায়। রাতে ইউক্রেনের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো খবরে বলেছিল, আজ শুক্রবার ভোরে আবারও হামলা হতে পারে।
গতকালের হামলার পর কিয়েভজুড়ে শহর ছাড়ার জন্য যে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল, আজ সেই অবস্থা নেই বলেই জানান হাসিনুল। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে। আজকে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আবারও প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয়। এরপর খানিকক্ষণ চুপচাপ। কিয়েভের সকালের স্নিগ্ধতা ভয়ের আবহে লীন হয়ে গেছে। হাজারো মানুষের মতো নতুন কোনো হামলার আশঙ্কায় সময় কাটাচ্ছেন বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গার হাসিনুল হক।

কিয়েভের নিভকি এলাকায় আজকের সকাল

উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেই পড়াশোনার জন্য চলে যান ইউক্রেন। এরপর সেখানে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি। তাঁর স্ত্রী ইউক্রেনের নাগরিক। এ দম্পতির একটি মেয়ে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেছেন।

হাসিনুল একসময় চাকরি করতেন। এখন ব্যবসায় করেন।

হাসিনুল হক বলছিলেন, ‘গতকাল একবারই মাত্র সকালে বেরিয়েছিলাম কিছু কেনাকাটার জন্য। তখন দেখেছি রাস্তায় গাড়ির ভিড়। শত শত গাড়ি নেমেছে কিয়েভের রাস্তায়, দীর্ঘ যানজট। কিয়েভের জন্য সেটা ব্যতিক্রম। সবাই তড়িঘড়ি করে কিয়েভ ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে ব্যস্ত।’

গতকাল গোটাকয় বিস্ফোরণ হয়েছে বলে জানান হাসিনুল হক। তাতে আন্তনভ নামের কিয়েভের বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। এটি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। রুশ বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে শেষতক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বন্দরটি এখনো ইউক্রেনের বাহিনীর হাতে আছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানান হাসিনুল। কিয়েভে আরেকটি বিমানবন্দর আছে। সেটি থেকে একসময় অভ্যন্তরীণ বিমান চললেও সম্প্রতি এটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত হয়েছে। এ বিমানবন্দর এখনো অক্ষত। কিয়েভ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের চেরোনবিল পারমাণবিক কেন্দ্র। এটি এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র হয়েছে। এটিও এখন রুশ বাহিনীর দখলে বলে জানান তিনি।

এই যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের মতো জরুরি পরিষেবার তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি বলে জানান হাসিনুল। তবে কিয়েভের এ অবস্থার সঙ্গে প্রান্তের এলাকাগুলোর মিল না–ও থাকতে পারে বলে ধারণা তাঁর। বছরের এ সময় সাধারণত তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ২ থেকে ৩ ডিগ্রি নিচে থাকে। তবে আজ এখানকার তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এই যুদ্ধাবস্থা যে হবে, তা বুঝতে পারেননি হাসিনুল। তাঁর ধারণা ছিল, অন্তত কিয়েভ আক্রান্ত হবে না। কিন্তু পরিস্থিতি হঠাৎই পাল্টে গেল। এই ভীতিকর অবস্থার মধ্যে আজকের দিনটি নিয়ে চিন্তা বেশি। কারণ তিনি শুনেছেন, আজই রুশ বাহিনী দখল করে নিতে পারে কিয়েভ। তারপর পরিস্থিতি কী হবে, তা ভবিষ্যৎই বলবে।

এই ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে সাহস হারাননি হাসিনুল। তিনি বলছিলেন, ‘পরিস্থিতি এমন যে, এটা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। হয়তো এর চেয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। কিন্তু এ মুহূর্তে দেশ ছাড়ার কোনো ইচ্ছা নেই।’

রাশিয়ার হামলার পর আজ কিয়েভের রাস্তায় লোক চলাচল একেবারেই কম

হাসিনুল জানান, তাঁর ইচ্ছা ছিল স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে ঘুরে যাবেন। মেয়ে চাকরি করে, এর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তারপরই এ অবস্থা। হাসিনুল হকের কথা, ‘দেশে যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ তাতে বাদ সাধল। এখন দেখি, পরিস্থিতি ভালো হলেই যাব।’