
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছিল রাশিয়া। ২৫ বছর পর সেই রাশিয়া এখন আবার বিশ্বনেতৃত্বের জায়গায় সরব হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় পশ্চিমা শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়ে মস্কো এখন বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। রাশিয়ার এই সাফল্যের পেছনে যিনি প্রধান ভূমিকা পালন করছেন, তিনি হলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
দুই যুগের বেশি সময় আগের সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং আজকের এই ‘রুশ পুনরুত্থান’ নিয়ে বিবিসির সাংবাদিক স্টিভেন রোজেনবার্গ একটি পর্যবেক্ষণধর্মী প্রতিবেদন লিখেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ১৯৯১ সালের আগস্টে তিনি মস্কোয় গিয়ে ‘মেশিন ট্রল কনস্ট্রাকশন ইনস্টিটিউট’ নামের সেখানকার একটি প্রতিষ্ঠানে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে চাকরি নেন। এর চার মাসের কম সময়ের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে কয়েক টুকরা হয়ে যায়। এটি সেখানকার অধিকাংশ মানুষের জন্য ছিল একটি বড় ধাক্কা। তবে রোজেনবার্গ ওই সময় মস্কোতে এমন বহু লোক পেয়েছেন, যাঁরা এই ভাঙনকে ‘স্বাধীনতা’ ও নতুন আশার বার্তা হিসেবে মনে করেছেন।
মস্কোতে রোজেনবার্গ যখন শিক্ষকতা করতেন, তখন ইরিনা নামের একজন সহকর্মী ছিলেন। সম্প্রতি ইরিনার সঙ্গে রোজেনবার্গের টেলিফোনে কথা হয়। ইরিনা বলেন, সোভিয়েতের পতন যে তাঁদের জন্য একটা বিয়োগান্ত কিছু, তা তাঁরা প্রথমে বুঝতেই পারেননি। এটা তাঁদের জন্য কত ক্ষতি বয়ে এনেছে, তা বুঝতে তাঁর অনেক সময় লেগে যায়। ইরিনা বলেন, আস্তে আস্তে তিনি রাশিয়ায় নতুন নতুন মানুষ দেখতে পেলেন; খোদ রাশিয়াকেই তাঁর নতুন বলে মনে হতে লাগল। এই ‘বিবর্তন’ ইরিনার ভালো লাগেনি। তিনি বলেন, বলা যায়, পুঁজিবাদের কুৎসিত চেহারা তাঁর কাছে প্রকাশ্য হচ্ছিল।
রোজেনবার্গ লিখেছেন, নব্বইয়ের দশকে মস্কোতে ওলেগ নামের এক যুবকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তখন ওলেগের বয়স ছিল বিশের কোঠায়, এখন থাকেন কানাডায়। ওলেগ বলেছেন, সোভিয়েতের পতনের পরপরই রাশিয়া টানাটানির মধ্যে পড়ে যায়। অবশ্য ব্যবসার নতুন সুযোগও সৃষ্টি হয়। তিনি ও তাঁর বন্ধুরা মিলে ওই সময় পোল্যান্ড থেকে পুরোনো গাড়ি এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঝাঁকাভর্তি মুরগির ঠ্যাং মস্কোয় এনে বিক্রি করতেন।
উত্তর ককেশাস অঞ্চলে নব্বইয়ের দশকে দুটি যুদ্ধ হয়। রুশ পার্লামেন্টে ট্যাংক থেকে গোলা ছোড়া হয়। এ সময় রাশিয়ায় অর্থনৈতিক ধস নামায় বহু লোক তাদের সঞ্চয় খোয়াতে বাধ্য হয়। ওই সময় ইরিনার মতো রুশ নাগরিকেরা সোভিয়েত ইউনিয়নের অভাব অনুভব করতে শুরু করেন। ইরিনা বলেন, তখন বুঝতে পারলাম সোভিয়েত ইউনিয়নের সবকিছুই খারাপ ছিল না।
‘কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নে তো গণতন্ত্র ছিল না, কথা বলার স্বাধীনতা ছিল না’—রোজেনবার্গের এই কথার পাল্টা জবাবে ইরিনা বলেন, ‘আপনি কোন গণতন্ত্রের ঘাটতির কথা বলছেন? এটা একেকজনের কাছে একেক রকম। সরকারের পর্দার আড়ালে কী হচ্ছে, তার সবটা হয়তো আমরা জানতে পারছি না, কিন্তু এটা জানা আদৌ কি আমাদের জন্য খুব জরুরি?’
২০০০ সালে পুতিন ক্ষমতায় আসার পর ক্রেমলিন আবার আস্তে আস্তে তার ক্ষমতা সুসংহত করতে শুরু করে। পুতিন ব্যবসা-বাণিজ্যে কড়াকড়ি আরোপ করেন। ব্যক্তি উদ্যোগের বাণিজ্য বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ওলেগের মতো অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমান। পুতিনের প্রতি তাঁদের কিছুটা ক্ষোভ থাকলেও ইরিনার মতো অনেকেই মনে করেন, রাশিয়ায় পুতিনের মতোই একজন ‘শক্তপোক্ত’ নেতা দরকার।
ইরিনা বলেন, তিনি মনে করেন, রাশিয়ার মতো বিশাল রাষ্ট্র কঠোর ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য রাজতন্ত্রকে তিনি সমর্থন করেন। তিনি রুশ সম্রাট জারের রাজত্বও অপছন্দ করবেন না।
‘পুতিন কি জারের অভাব পূরণ করতে পারবেন?’—এই প্রশ্নের জবাবে ইরিনা বলেন, ‘আমার মনে হয়, হ্যাঁ, তিনি তা পারবেন। আমাদের প্রেসিডেন্ট শুধু কাজ করছেন বললে কম বলা হবে, তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এ জন্য আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি।’
‘ক্রিমিয়া দখল এবং ইউক্রেন ও সিরিয়ায় নাক গলানোর জন্য পশ্চিমারা তো পুতিনকে পছন্দ করছে না’—এ কথার জবাবে হাসতে হাসতে ইরিনা বলেন, তাঁরা পুতিনকে পছন্দ করবেন কেন? তিনি কি কোনো সুন্দরী রমণী? তিনি তো একজন শক্তিধর নেতা।
অন্যদিকে কানাডায় থাকা ওলেগ মনে করেন, রাশিয়া যে ঝক্কি কাটিয়ে উঠে আসছে, এটি তাঁকে আনন্দিত করে। পোল্যান্ডের পুরোনো গাড়ি বা যুক্তরাষ্ট্রের মুরগির ঠ্যাং এখন আর রাশিয়াকে আমদানি করতে হয় না। আজ মস্কো তাঁর পেশি প্রদর্শন করছে; কাল এই প্রতিপত্তি কত দূর গড়াবে, সেটাই দেখার বিষয়।