ক্রেমলিনের কৌশল

মোবাইলে ‘সুপার অ্যাপ’ ম্যাক্স, রুশদের ফোনের ‘গোপন প্রবেশদ্বার’

ম্যাক্স মূলত রাশিয়ার নিজস্ব ‘সুপার অ্যাপ’। এই অ্যাপে বিভিন্ন ধরনের সেবা একটিমাত্র প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়েছে। যা রাশিয়ার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে। তবে সম্প্রতি এক গবেষণা বলছে, নজরদারির জন্য ম্যাক্স অ্যাপ হলো সবচেয়ে চতুর এবং ভীতিকর এক মাধ্যম।

ম্যাক্স অ্যাপটি তৈরি করেছে রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি ‘ভিকোনতাকতে’। এই প্রতিষ্ঠানটি দেশটির সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত
ছবি: এএফপি

রাশিয়ায় গত দেড় বছরে দেশটির কয়েক কোটি মানুষকে তাদের মোবাইল ফোনে একটি নতুন অ্যাপ ইনস্টল করতে বাধ্য করা হয়েছে। রঙিন আইকনযুক্ত বার্তা আদান–প্রদান ও লেনদেনের এই অ্যাপটির নাম ‘ম্যাক্স’। তবে গবেষণা বলছে, এই অ্যাপ আসলে ব্যবহারকারীদের ফোনে নজরদারির ‘গোপন প্রবেশদ্বার’ হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে সরকারের নজরদারি চলছে।

রুশ কর্তৃপক্ষ এই অ্যাপটিকে যোগাযোগের অ্যাপ টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের ‘দেশপ্রেমিক বিকল্প’ হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশটির নামীদামি তারকারাও তাঁদের র‍্যাপ ভিডিও এবং কমেডি শোতে এই অ্যাপের প্রচারণা চালিয়েছেন। ফলে চলতি গ্রীষ্মেই এটি রাশিয়ার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপে পরিণত হয়েছে।

অ্যাপটি তৈরি করেছে রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি ‘ভিকোনতাকতে’। এই প্রতিষ্ঠানটি দেশটির সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। জানা গেছে, এই অ্যাপে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনেরও পরোক্ষ মালিকানা রয়েছে।
ম্যাক্স মূলত রাশিয়ার নিজস্ব ‘সুপার অ্যাপ’, যেখানে বিভিন্ন ধরনের সেবা একটিমাত্র প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়েছে। এটি এমন এক অ্যাপ, যার ভেতর একাধিক ‘মিনি অ্যাপ’ রয়েছে—যেগুলো রাশিয়ার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং সেবা, টেলিগ্রামের বিকল্প হিসেবে মেসেজিং সেবা এবং সরকারের নানা সেবা প্রদানকারী অ্যাপ।

বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত সুপার অ্যাপ হলো চীনের ‘উইচ্যাট’, যা দেশটির সব ধরনের সেবার পাশাপাশি সরকারের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির মূল মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তবে উইচ্যাট যেখানে চীনের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে বহু দশক ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে, সেখানে ম্যাক্সকে হঠাৎ করেই এমন এক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যারা একসময় অনেকটাই মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পেত।

সাম্প্রতিক এক ফরেনসিক গবেষণায় ম্যাক্সের ভয়াবহ নজরদারি ক্ষমতার বিস্তারিত চিত্র সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক রয়া এনসাফি বলেন, ম্যাক্স অ্যাপের ক্ষমতা মূলত প্রতিটি ব্যবহারকারীর ডিভাইসে থাকা পুরো মিনি অ্যাপ ইকোসিস্টেমে একটি ‘গোপন প্রবেশদ্বারের’ শামিল।

ম্যাক্স অ্যাপ ব্যবহার করার সময় মনে হয়—আপনি জানেন না আর কে বা কারা আপনাকে নজরদারিতে রাখছে।...এটি ব্যবহারের সময় সব সময় একটা অশুভ অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
নিকোলাই, মস্কোর বাসিন্দা

রয়া এনসাফি বলেন, ‘আমরা এক দশক ধরে রাশিয়ার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের তীব্রতা বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করেছি। কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো তাদের নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালাতে এযাবৎ যেসব কৌশল নিয়েছে, তার মধ্যে ম্যাক্স হলো সবচেয়ে চতুর এবং ভীতিকর একটি মাধ্যম।’ তিনি বলেন, ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ম্যাক্স হলো যেকোনো সরকারের জন্য অনুকরণীয় একটি নীলনকশা বা ব্লুপ্রিন্ট। এটি ইরান, কাজাখস্তান ও ভারতের মতো সরকারগুলো সামনে যা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে, তার এক অত্যাধুনিক রূপ প্রদর্শন করছে।

এনসাফির গবেষক দল রাশিয়ায় ব্যবহৃত অ্যাপটির একটি সংস্করণ ডাউনলোড করতে সক্ষম হয়। তাতে দেখা যায়, ব্যবহারকারীদের অজান্তেই তাদের ডিভাইসের স্ক্রিনশট এবং এর মিনি অ্যাপগুলোর তথ্যের ছবি তুলতে পারে ম্যাক্স। এটি এসব মিনি অ্যাপে জমা থাকা সব তথ্য, বার্তা এবং আর্থিক লেনদেনের হিসাবে প্রবেশ করতে সক্ষম। এমনকি ব্যবহারকারী টের পাওয়ার আগেই তার পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কাউকে বিভ্রান্তও করতে পারে অ্যাপটি।

সাম্প্রতিক এক ফরেনসিক গবেষণায় ম্যাক্স অ্যাপের ভয়াবহ নজরদারি ক্ষমতার বিস্তারিত চিত্র সামনে এসেছে

এমনকি মিনি অ্যাপগুলোর ভেতর ক্ষতিকর কোড প্রবেশের সুযোগও রয়েছে ম্যাক্স অ্যাপে। এনসাফির মতে, এর অর্থ হলো রাশিয়ার সরকার চাইলে ম্যাক্সকে ব্যবহার করে সাইবার হামলাও চালাতে পারবে।

এই গবেষণা ম্যাক্সের নজরদারি ক্ষমতা নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। তবে এনসাফি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে জানান, ব্যবহারকারীদের ফোনে যদি টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ ইনস্টল করা থাকে, তবে অ্যাপটি সরাসরি সেগুলোতে ঢুকতে পারে না। যদিও রাশিয়া ইতিমধ্যে এই দুটি অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে।

রাশিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান বা এর সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মরত বহু নাগরিককে কার্যত ‘ম্যাক্স’ ব্যবহারে বাধ্য করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এমনকি স্কুলের শিক্ষার্থীদেরও তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ এই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার জন্য চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।

ব্যবহারকারীদের অজান্তেই তাদের ডিভাইসের স্ক্রিনশট এবং এর মিনি অ্যাপগুলোর তথ্যের ছবি তুলতে পারে ম্যাক্স। এটি মিনি অ্যাপে জমা থাকা সব তথ্য, বার্তা এবং আর্থিক লেনদেনের হিসাবে প্রবেশ করতে সক্ষম।

মস্কোর একজন স্কুলশিক্ষক জানান, নগর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার পর তাঁদের স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের যোগাযোগের সব কাজ ম্যাক্সে স্থানান্তরিত করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘গত বছরের মার্চে আমাদের স্কুলের প্রধান আমাদের সরাসরি ডেকে বলেন, এখন থেকে সবকিছুই ম্যাক্সে হবে। এর মধ্যে অভিভাবকদের সঙ্গে চ্যাট, হোমওয়ার্ক পাঠানো এবং স্কুলের অন্য সব যোগাযোগও অন্তর্ভুক্ত ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে “না” বলার আসলেই কোনো সুযোগ নেই। তাই শেষ পর্যন্ত অ্যাপটি ব্যবহার করতেই হয়।’

সেন্ট পিটার্সবার্গের এক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী দানিল। তিনি বলেন, শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে ম্যাক্স অ্যাপটি ডাউনলোড করতে বাধ্য হন। তাঁকে জানানো হয়েছিল, এই অ্যাপের মাধ্যমে তৈরি কিউআর কোড ছাড়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন বা হলে প্রবেশ করতে পারবে না।

দানিল জানান, অ্যাপটির নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে তাঁর মনে সংশয় ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতে এর বাইরে কোনো বিকল্প ছিল না বললেই চলে।
কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীর মতে, রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণির কাছে ম্যাক্স অ্যাপটির ব্যবহার কেবল লোকদেখানো। দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য তাঁরা এখনো টেলিগ্রাম ও সিগন্যাল অ্যাপ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছেন।

ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানান, তিনি ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু শুধু ম্যাক্স ব্যবহার করার জন্যই আলাদা ফোন কিনেছেন। আর আগের মতোই তাঁদের প্রধান ফোন এবং পছন্দের মেসেজিং অ্যাপগুলো দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে যাচ্ছেন। ‘এসবই লোকদেখানো। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কেউ সত্যি সত্যি এটা ব্যবহার করে না’, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন ওই ব্যক্তি।

আমরা এক দশক ধরে রাশিয়ার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের তীব্রতা বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করেছি। কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো তাদের নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালাতে এযাবৎ যেসব কৌশল নিয়েছে, তার মধ্যে ম্যাক্স হলো সবচেয়ে চতুর এবং ভীতিকর একটি মাধ্যম।
রয়া এনসাফি, সহযোগী অধ্যাপক, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়

খবরের প্রধান উৎস হিসেবে রাশিয়ার মানুষের কাছে টেলিগ্রাম অ্যাপের জায়গা এখনো দখল করতে পারেনি ম্যাক্স। গণমাধ্যম, ব্লগার এবং সরকারি কর্মকর্তারা বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে সংবাদ ও মতামত পৌঁছে দিতে যে পাবলিক চ্যানেলগুলো ব্যবহার করেন, সেগুলো ম্যাক্সে এখনো তেমন উন্নত নয়।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে কয়েকজন ‘ম্যাক্স’ ব্যবহারকারী জানান, অ্যাপটির ডিজাইন এবং কাজের ধরন রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় বার্তা আদান–প্রদানের প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রামের মতোই। তবে এর গোপনীয়তা এবং সম্ভাব্য নজরদারি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।

মিনি-অ্যাপগুলোর মধ্যে ক্ষতিকর কোড প্রবেশের সুযোগও রয়েছে ম্যাক্স অ্যাপে। এনসাফির মতে, এর অর্থ হলো রাশিয়ার সরকার চাইলে ম্যাক্সকে ব্যবহার করে সাইবার হামলাও চালাতে পারবে।

মস্কোর ৩৪ বছর বয়সী বাসিন্দা নিকোলাই বলেন, ‘ম্যাক্স ব্যবহার করার সময় মনে হয়—আপনি জানেন না আর কে বা কারা আপনাকে নজরদারিতে রাখছে।’ অ্যাপটি দেখতে বেশ আধুনিক এবং আকর্ষণীয় হলেও নিকোলাই জানান, এটি ব্যবহারের সময় সব সময় একটা অশুভ অনুভূতির সৃষ্টি হয়। ‘অন্য অ্যাপগুলোর বিকল্প সুবিধা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে এটি বেশি বেশি ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু তা–ও মনে হয় কোথাও যেন একটা বড় ভুল থেকে যাচ্ছে’, উল্লেখ করেন তিনি।

ম্যাক্সকে এত দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার সাফল্যকে একটি ‘সতর্কবার্তাসূচক সংকেত’ হিসেবে দেখা উচিত বলে মনে করেন রয়া এনসাফি। চীন ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় ৩৫ বছর সময় নিয়েছে। অথচ রাশিয়া মাত্র এক দশকের মধ্যেই মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারকে পুরোপুরি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত–ব্যবস্থার মধ্যে বন্দী করে এই কঠোর বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

রয়া এনসাফি বলেন, ‘পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, ব্যক্তিগত যোগাযোগের যে প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো—তা–ও পরিবর্তিত হচ্ছে। আর কর্তৃত্ববাদী  সরকারগুলোর পক্ষ থেকে আসা এই আক্রমণাত্মক নিয়ন্ত্রণচেষ্টাও অত্যন্ত তীব্র।’

গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ম্যাক্স ও ভিকোনতাকতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।