নরওয়ের দুর্গম দ্বীপপুঞ্জ স্ভালবার্দের গ্রাম লংইয়ারবিয়েন। দীর্ঘ মেরুরাত্রির শেষে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি এখানে প্রথম সূর্য দেখা যায়। ছবিটি এর কিছুদিন আগে তোলা
নরওয়ের দুর্গম দ্বীপপুঞ্জ স্ভালবার্দের গ্রাম লংইয়ারবিয়েন। দীর্ঘ মেরুরাত্রির শেষে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি এখানে প্রথম সূর্য দেখা যায়। ছবিটি এর কিছুদিন আগে তোলা

অন্য দুনিয়া

বরফ গলছে, ঘরবাড়ি ভাঙছে, চরম সংকটে নরওয়ের গ্রামটি 

প্রতিবছর এক থেকে চার মিটার পর্যন্ত বরফের স্তর পাতলা হয়ে যাচ্ছে নরওয়ের দুর্গম দ্বীপপুঞ্জ স্ভালবার্দের গ্রাম লংইয়ারবিয়েনে।

নরওয়ের দুর্গম দ্বীপপুঞ্জ স্ভালবার্দের একটি ছোট্ট গ্রাম লংইয়ারবিয়েন। উত্তর মেরুর ঠিক আগে সুমেরু বা আর্কটিক অঞ্চলের শেষ জনপদ এটি। রোমাঞ্চসন্ধানী পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় গ্রামটি এখন চরম অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে সাত গুণ দ্রুতগতিতে তাপমাত্রা বাড়ায় পৃথিবীর উত্তরের এই জনপদ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ শিকার।

স্ভালবার্দের প্রায় ৫৭ শতাংশ ভূমিই হিমবাহে ঢাকা। কিন্তু উষ্ণায়নের কারণে ফক্সফোনা নামের পরিচিত হিমবাহটি দ্রুত গলে যাচ্ছে। এখানকার হিমবাহ–গবেষক অধ্যাপক অ্যান্ডি হডসন বলেন, হিমবাহটি ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। তুষারের বদলে মেঘ থেকে এখন বৃষ্টি ঝরছে বেশি। প্রতিবছর এক থেকে চার মিটার পর্যন্ত বরফের স্তর পাতলা হয়ে যাচ্ছে, যা দ্বীপটির জন্য অশনিসংকেত।

সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পারমাফ্রস্ট’ বা সারা বছর বরফে জমাট বাঁধা মাটির স্তর গলে যাওয়া। মাটির নিচের বরফ গলার কারণে ভূমিধস হচ্ছে, ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে দেয়ালে ফাটল ধরছে। অনেক বাড়ি এরই মধ্যে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র আবাসনসংকট। এর পাশাপাশি তলদেশের পাথর থেকে ভারী ধাতু চুইয়ে খাওয়ার পানিতে মিশে যাচ্ছে। ফলে কলের পানি পানে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বাধ্য হয়ে সুপারমার্কেটের ফিল্টার করা পানি খেতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।

তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলে তুষারধসের ঝুঁকিও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। একসময়ের বরফের মরুভূমিতে এখন প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। ২০১৫ সালে এক ভয়াবহ তুষারধসে দুজনের মৃত্যুর পর দুর্যোগ মোকাবিলায় পাহাড়ে ‘তুষারবেড়া’ নির্মাণ করা হয়েছে, চালু করা হয়েছে সতর্কবার্তা ব্যবস্থা।

প্রকৃতির এই রুদ্ররোষের প্রভাব পড়েছে এখানকার জনপ্রিয় পর্যটনশিল্পেও। পর্যাপ্ত বরফ না থাকায় পর্যটকদের জন্য রাখা স্নোমোবাইলগুলো (বরফের ওপর চলাচলের জন্য তৈরি ইঞ্জিনচালিত যান) গ্রাম থেকে অন্তত সাত মাইল দূরে সরিয়ে নিতে হয়েছে। হিমবাহ ধসে সাগরে পড়ার ঝুঁকির কারণে পর্যটকদের নিরাপদ দূরত্বে থাকতে বলা হচ্ছে।

চরম বৈরী প্রকৃতির এই গ্রামের ২ হাজার ৬০০ বাসিন্দা শীতের চরম আবহাওয়ায় অভ্যস্ত হলেও এখন তারা এক নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি। টিকে থাকার লড়াইয়ে বাধ্য হয়ে তারা পরিবর্তনশীল প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। লংইয়ারবিয়েন গ্রামের এই অভাবনীয় সংকট যেন অন্যান্য আর্কটিক অঞ্চলসহ পুরো বিশ্বের জন্যই এক চরম সতর্কবার্তা।