ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড–ডেনমার্কের নিরাপত্তা চুক্তি সই, কী আছে চুক্তিতে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের নেতাদের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিষয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত বক্তব্যের পর দুই পক্ষের সম্পর্কে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, এই চুক্তির ফলে তা কিছুটা কমেছে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আয়োজিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা দীর্ঘমেয়াদি ও চমৎকার একটি সম্পর্ক হতে যাচ্ছে। এটি ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও সবার জন্যই অসাধারণ একটি বিষয়।’

১০ পৃষ্ঠার এ চুক্তিতে বলা আছে, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে দুটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করবে।

গ্রিনল্যান্ডে এখনো উত্তোলন না করা বিরল খনিজের মজুত রয়েছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নতুন নৌপথ খুলে যাওয়ার কারণেও গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব বেড়ে গেছে।

গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণে নারসারসুয়াক ও পূর্বাঞ্চলে মেস্টারসভিগে এসব ঘাঁটি স্থাপন করা হবে। এর পাশাপাশি, দ্বীপটির উত্তরে যুক্তরাষ্ট্রের পিটুফিক ঘাঁটিও থাকবে।

চুক্তিতে ‘ডেনমার্ক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার’ প্রতি আবারও সমর্থন জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’-এর বিষয়ও স্বীকার করা হয়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ট্রাম্প বারবার বলে আসছিলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এতে ন্যাটোর সদস্য ডেনমার্ক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং ন্যাটো জোটের পক্ষ থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আয়োজিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে শেষবার বৈঠক করে নিচ্ছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনসহ অন্যরা। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ডেনমার্কের কনসাল জেনারেলের বাসভবনে। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথের ওপর অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ডে এখনো উত্তোলন না করা বিরল খনিজের মজুত রয়েছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নতুন নৌপথ খুলে যাওয়ার কারণেও দ্বীপটির গুরুত্ব বেড়ে গেছে।

নিশ্চিন্ত হওয়া

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, এ চুক্তির ফলে তাঁর দেশ ‘গতকালের তুলনায় এখন ভালো অবস্থানে’ রয়েছে।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর সাংবাদিকদের ফ্রেডেরিকসেন বলেন, ‘সবাই জানেন, আমরা অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমি আশা করি, এ চুক্তি গ্রিনল্যান্ডে আরও শান্তি ফিরিয়ে আনবে।’

সবাই জানেন, আমরা অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমি আশা করি, এই চুক্তি গ্রিনল্যান্ডে আরও শান্তি ফিরিয়ে আনবে, কারণ সময়টা কঠিন ছিল।
মেটে ফ্রেডেরিকসেন, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী

এর আগে ফ্রেডেরিকসেন ট্রাম্পকে বলেছিলেন, ‘আপনার বার্তা তো স্পষ্টই ছিল। আপনি চান না, প্রতিপক্ষরা খুব কাছে চলে আসুক। আমিও এর সঙ্গে পুরোপুরি একমত। আর এ চুক্তির মাধ্যমে তারা (প্রতিপক্ষরা) কাছে আসতে পারবে না।’

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেদেরিক নিলসেন বলেন, উত্তর আমেরিকার ও আটলান্টিক পারের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, ‘এই চুক্তি থেকে স্পষ্ট যে আমরা আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন এবং সেই অনুযায়ী কাজ করছি।’

পরে নিলসেন বলেন, ‘এ চুক্তি ভালো দিকে এগোনোর একটি পদক্ষেপ হলেও, দেশে ফিরে আমাদের পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে, আর আমাদের জন্য সেটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে করতে হবে।’

চুক্তি নিয়ে কোপেনহেগেনের বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী গ্যাভিন শার্প এএফপিকে বলেন, ‘পরিস্থিতি তো একই রয়ে গেছে।’ তিনি মনে করেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল, মার্কিন ভোটারদের সমর্থন পাওয়া। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি ঠিক আগের চুক্তিই।’

নতুন চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত খাতগুলোতে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের দেশগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ চীন ও রাশিয়া যেন আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে না পারে এবং এটা করতে গেলে তাদের বাধা দেওয়া যায়।

নতুন চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত খাতগুলোতে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের দেশগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ চীন ও রাশিয়া যেন আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে না পারে এবং এটা করতে গেলে তাদের বাধা দেওয়া যায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রধান আন্তোনিও কোস্তা মঙ্গলবারের এ চুক্তিকে ‘আটলান্টিক পারের সহযোগিতা ও আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।

গ্রিনল্যান্ডের নুক শহরে সের্মিৎসিয়াক পর্বতের সামনে বাড়িঘর। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কোস্তা লিখেছেন, ‘শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ আর্কটিক অঞ্চল নিশ্চিত করতে গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক এবং আমাদের আটলান্টিক পারের অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যেতে ইইউ প্রস্তুত।’

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসও এ চুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, ৫৭ হাজার মানুষের আবাসস্থল গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা অর্জন করলেও এ চুক্তি মেনে চলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে গ্রিনল্যান্ডকে ন্যাটোতে থাকতে হবে অথবা ন্যাটোতে যোগ দিতে হবে।

১৯৫১ সালের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির সুযোগ আগেই দেওয়া হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে এ জন্য ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে আগে থেকে জানাতে হতো। ২০০৪ সালে চুক্তিটি হালনাগাদ করা হয়।