স্পেনের উত্তরাঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো
স্পেনের উত্তরাঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো

এক দিনেই ‘দুই সূর্যাস্ত’ দেখার অপেক্ষায় স্পেনের গুটিকয় বাসিন্দার ছোট্ট এক গ্রাম

গ্রামটিতে বাসিন্দার সংখ্যা হাতে গোনা। সেখানে নেই কোনো রেস্তোরাঁ, দর্শনার্থীও খুব কম দেখা যায়। তবু স্পেনের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো নামের এই ছোট্ট ও নিস্তব্ধ গ্রামটি এক অসাধারণ রাতের অপেক্ষায় আছে।

শান্ত গ্রামের অভাব নেই। কিন্তু স্পেনের উত্তরাঞ্চলীয় বার্গোস প্রদেশে অবস্থিত ক্ষুদ্র এই গ্রাম যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। এখানে নেই কোনো রেস্তোরাঁ, নেই কোনো দোকান। আছে একটি বার, যা কখনোই খোলে না। আর আছে একটি বুদেগা (ঐতিহ্যবাহী মদের ভান্ডার), যা আর কোনো দিন খুলবে না।

তবে সপ্তাহে একবার এই নীরবতার ছন্দ ভাঙে। কাছের একটি বেকারি থেকে আসা সাদামাটা একটি সাদা গাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে গ্রামে ঢুকে এবং সেখানে বসবাসরত হাতে গোনা কয়েকজন বাসিন্দার কাছে রুটি পৌঁছে দেয়। কিছুক্ষণের জন্য হলেও সেই গাড়ি যেন ঘুমন্ত গ্রামটিকে জাগিয়ে তোলে।

গ্রামের অল্প কয়েকজন বাসিন্দার কাছে এটাই জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। এটি এমন এক এলাকা, যেখানে বেশির ভাগ দিন উল্লেখ করার মতো কোনো ঘটনাই ঘটে না। তবে চলতি মাসেই নিস্তব্ধ গ্রামটি সাময়িকভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানগুলোর একটিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

১২ আগস্ট আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ পার হয়ে যাবে। ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে এমন একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।

মাদ্রিদভিত্তিক পদার্থবিদ ড. মারিয়া তেরেসা লোপেজ সানচেজ বলেন, ১৯১২ সালের পর এবারই প্রথম স্পেনের মূল ভূখণ্ড থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা সম্ভব হবে।

তবে এই পূর্ণ সূর্যগ্রহণ কেবল ইউরোপের একটি সরু পথজুড়েই দেখা যাবে। আর আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো গ্রামটি ঠিক সেই পথের মধ্যেই পড়বে। তবে সূর্যগ্রহণ দেখতে এই ছোট্ট গ্রামটির এতটা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার পেছনে একটি বিশেষ কারণ হলো এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। এখানকার সোনালি গমখেত আর নিচু টিলার বিস্তৃত প্রান্তরের কারণে খুব ভালোভাবে পশ্চিম দিগন্তকে দেখা যায়।

গ্রামটিতে ভবন খুবই কম। কৃত্রিম আলোও খুব কম। অন্য জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানগুলোর তুলনায় এখানে মানুষের ভিড়ও প্রায় নেই বললেই চলে। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময়টাও গ্রামটিকে আরও বিশেষ করে তুলেছে। কারণ, এই সূর্যগ্রহণ হবে সূর্যাস্তের ঠিক আগে। এতে অল্প কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুবার গোধূলির আবহ তৈরি হবে।

পদার্থবিদ মারিয়া তেরেসা লোপেজ সানচেজের ভাষায়, ‘এটা যেন কয়েক মিনিটের মধ্যে দুটি সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা।’

এতেই শেষ নয়। ওই রাতেই আকাশে দেখা যাবে বিখ্যাত পার্সেইড উল্কাবৃষ্টি। এর মানে, একই রাতে দুটি বিরল মহাজাগতিক ঘটনা ঘটবে।

কোথা থেকে সূর্যগ্রহণ সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যাবে, তা নির্দ্বিধায় বলে দিলেন স্থানীয় বাসিন্দা সারা আলভারেজ রদ্রিগেজ। তিনি বলেন, ‘গুহার দিকে উঠে যান। সেখান থেকে সবকিছুই দেখা যায়।’

১৯৩৭ সালে আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো গ্রামে জন্ম নেওয়া সারা আলভারেজ জীবনের পুরোটা সময় এখানেই কাটিয়েছেন। প্রায় ৯ দশকের জীবনে তিনি নিজের চোখে দেখেছেন কীভাবে গ্রামটি আমূল বদলে গেছে।

সারা বলেন, ১৯৫০-এর দশকে এই গ্রামে প্রায় ২০০ মানুষের বসবাস ছিল। তখন এখানে বেশ কয়েকটি ছোট দোকানও ছিল। গ্রামের মাছ বিক্রেতারা সাইকেলে করে আশপাশের গ্রামগুলোয় গিয়ে মাছ বিক্রি করতেন।

৭৩ বছর বয়সী রাউল গ্রান্দে রেভিয়া এই গ্রামেই জন্মেছিলেন। তবে তিনি ছোটবেলায় মাদ্রিদে চলে যান।

রেভিয়া স্মৃতিচারণা করে বলেন, একসময় একজন ডাকপিওন গাধার পিঠে চড়ে গ্রামে চিঠি ও সংবাদপত্র পৌঁছে দিতেন। ডাকপিওন কখনো কখনো আধোঘুমে থাকলেও গাধাটি নিজেই জানত কোথায় থামতে হবে। এমনকি গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে থাকা ছোট্ট ডাকঘরেও সে ঠিকই পৌঁছে যেত।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই গ্রামের মানুষের জীবিকা ছিল বৃষ্টিনির্ভর কৃষি, সবজি চাষ, আঙুরের বাগান এবং গবাদিপশু পালন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কৃষিকাজ যান্ত্রিক হয়ে ওঠে। আশপাশে অন্য ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগও ছিল না। ফলে অনেকেই কাজের খোঁজে মাদ্রিদ, বিলবাও, বার্সেলোনাসহ বিভিন্ন শহরে চলে যান।

বর্তমানে গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দার চেয়ে আশপাশের পাহাড়ি ঢালে চরতে থাকা ছাগলের সংখ্যাই বেশি। যেখানে একসময় শত শত গ্রামবাসী মাঠে কাজ করতেন, সেখানে এখন দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত সূর্যমুখীর খেত। তবে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পরিবারগুলোর অনেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে আবার গ্রামে ফিরছেন।

এই বিরল মহাজাগতিক ঘটনাটি দেখতে রাউল গ্রান্দে তাঁর সঙ্গী, ছেলে, নাতি-নাতনি এবং বন্ধুদের নিয়ে গ্রামে ফিরবেন। তাঁর ভাইও আসবেন তিন সন্তান, এক নাতি ও বোনকে নিয়ে। সব মিলিয়ে তাঁদের প্রায় ২০ জনের একটি দল হবে, যা গ্রামের মোট জনসংখ্যার দ্বিগুণ। ওই গ্রামের এখন বাসিন্দা সংখ্যা মাত্র ১০ জন।

শুধু তাঁরাই নন। সারা আলভারেজের তথ্য অনুসারে, গ্রামের আরও অনেক বাসিন্দাই তাঁদের বন্ধু ও স্বজনদের আতিথ্য দেবেন। স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ভেনেজুয়েলা থেকেও অনেকে এই বিরল সূর্যগ্রহণ দেখতে গ্রামে আসবেন।

গ্রামটির কাছাকাছি প্যারাডর দে লেরমা হোটেলের অবস্থান। এটি একসময় লেরমার ডিউকের প্রাসাদ ছিল। সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে হোটেলটির সব কক্ষ ভাড়া হয়ে গেছে। কাস্তিয়া ই লেওন অঞ্চলের পর্যটন বোর্ডের কর্মকর্তা আলবের্তো বস্কে কোয়েলো বলেন, পুরো অঞ্চলে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

কাস্তিয়া বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব আবাসনই আগে থেকেই বুকড হয়ে গেছে। আসলে অনেক আগেই বুকিং সম্পন্ন হয়েছে।’ তাঁর ভাষ্য, সূর্যগ্রহণ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা ‘সবচেয়ে পরিচিত জায়গা নয়, সবচেয়ে ভালো জায়গা’ খুঁজছিলেন। কারণ, তাঁদের লক্ষ্য ছিল সর্বোত্তম পরিবেশে সূর্যগ্রহণ দেখা।

সপ্তাহে কাছের একটি বেকারি থেকে আসা গাড়ি গ্রামে গিয়ে সেখানে বসবাসরত হাতে গোনা কয়েকজন বাসিন্দার কাছে রুটি পৌঁছে দেয়

রাউল গ্রান্দে বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পরিবার সূর্যগ্রহণ দেখতে স্পেনে আসার পরিকল্পনা করছে। মাদ্রিদে থেকে যেন তাঁরা পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ হারিয়ে না ফেলেন, সে জন্য তিনি আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন—কেউ তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে পারবেন কি না। তাঁর বিশ্বাস, স্পেনে সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য এটাই সেরা স্থান।

বার্গোস প্রদেশজুড়ে বিভিন্ন শহর ও গ্রামে সূর্যগ্রহণ দেখতে নানা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। তবে আভেইয়ানোসা দে মুয়োনোর স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা গ্রামের ওপরে থাকা গুহাগুলোর দিকেই ছুটবেন। উঁচুতে অবস্থিত এই গুহাগুলো এই বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য উপভোগের আদর্শ স্থান বলে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে গুহাগুলোর গুরুত্ব শুধু সুন্দর দৃশ্য দেখার জন্যই নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামের মানুষ এখান থেকেই একসঙ্গে সূর্যাস্ত দেখেছেন। এমনকি গ্রামের এক সাবেক বাসিন্দার ইচ্ছা অনুযায়ী, তাঁর মৃত্যুর পর দেহভস্মও এখানেই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে জায়গাটি গ্রামবাসীর কাছে গভীর আবেগ ও স্মৃতির অংশ।

আভেইয়ানোসা এমন একটি গ্রাম, যেটি সারা আলভারেজ কখনো ছেড়ে যাননি। সারা বলেছেন, তিনি কখনো গ্রামটি ছেড়ে যাবেন না। অন্যদিকে রাউল গ্রান্দে অন্য জায়গায় চলে গেলেও প্রায় প্রতিবছরই গ্রামে আসেন। প্রতি গ্রীষ্মে সারা আলভারেজের মেয়েরাও বাড়িতে আসেন।

পূর্ণ সূর্যগ্রহণের দিন আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো গ্রামটি আবারও মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠবে। আসবে সেই অসাধারণ কয়েকটি মুহূর্ত—যখন অল্প সময়ের ব্যবধানে দুবার নেমে আসবে গোধূলির অন্ধকার। আর স্পেনের সবচেয়ে উপেক্ষিত গ্রামগুলোর একটি কিছুক্ষণের জন্য যেন বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।