ইমানুয়েল মাখোঁ ও ডোনাল্ড টাস্ক
ইমানুয়েল মাখোঁ ও ডোনাল্ড টাস্ক

বিশ্লেষণ

ইউরোপের নতুন বাস্তবতা, প্রতিবেশীদের সম্পর্কে ফাটল

মাত্র ছয় দিনেই এক নতুন ‘বিশ্ব’ গড়লেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সপ্তম দিনে এসে ইউরোপের সাবেক মিত্ররা হয়তো আশা করেছিল, তিনি একটু শান্ত হবেন; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। গত শনিবার গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর ট্রাম্পের প্রতিটি পদক্ষেপ পশ্চিমা বিশ্বের পুরোনো নিয়মকানুনকে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির ভাষায়, এটি কেবল কোনো পরিবর্তন নয়; বরং এক ‘বিরাট বিচ্ছেদ’।

পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার সেই মজবুত ‘ট্রান্স আটলান্টিক’ বা আটলান্টিকপারের দেশগুলোর পারস্পরিক বিশ্বাস এখন অতীত। এর পরিবর্তে তৈরি হয়েছে এক নিষ্ঠুর ও আইনহীন ক্ষেত্র, যেখানে কেবল যার গলা বড় এবং যে শক্তিমান, সে–ই জয়ী হয়।

২০১৯ সাল থেকেই ডেনমার্কের বরফঘেরা এলাকা গ্রিনল্যান্ডের প্রতি আকাঙ্ক্ষা ছিল ট্রাম্পের। কিন্তু গত এক সপ্তাহে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো মিত্রের প্রতি তাঁর হুমকির ভাষা ইউরোপকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ট্রাম্প সরাসরি হুংকার দিয়ে বলেছেন, ‘যেকোনো উপায়ে আমরা গ্রিনল্যান্ড দখল করব, প্রয়োজনে কঠিন পথ বেছে নেব।’

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর মতে, সপ্তাহটি শুরুই হয়েছে আগ্রাসন ও শুল্ক আরোপের হুমকির মধ্য দিয়ে। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে যে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের মতো মিত্রকেও তোষণের ভাষা ব্যবহার করতে হচ্ছে। দাভোসে মাখোঁ বলেন, ‘পেশিশক্তির চেয়ে আইনের শাসন এবং আধিপত্যের চেয়ে সম্মানই ফ্রান্সের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

পেশিশক্তির চেয়ে আইনের শাসন এবং আধিপত্যের চেয়ে সম্মানই ফ্রান্সের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ
ইমানুয়েল মাখোঁ, প্রেসিডেন্ট, ফ্রান্স

গত বছর থেকে ট্রাম্প ক্রমাগত ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বিষিয়ে তুলছেন। একদিকে ইউক্রেনের সহায়তা বন্ধ করা, অন্যদিকে রাশিয়ার সুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কথা বলা—সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ইইউ নেতাদের এক বৈঠকের পর কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা জানান, সবাই একমত যে সম্পর্ক হওয়া উচিত ‘আন্তরিক ও সম্মানজনক’, যা বর্তমান হোয়াইট হাউসের আগ্রাসী আচরণের ঠিক বিপরীত।

শেষ ভরসা হারাল ইউরোপ

অবশেষে যেন ঘোর কেটেছে সবার। যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো সেই বিশ্বস্ত বন্ধু বা নির্ভরযোগ্য মিত্র নেই—এই রূঢ় বাস্তবতা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু থেকেই যে সতর্কবার্তা পাওয়া যাচ্ছিল, অনেকের জন্য এই উপলব্ধি ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস গত বৃহস্পতিবার বলেন, গত এক সপ্তাহে আটলান্টিকপারের দেশগুলোর সম্পর্কে নিশ্চিতভাবেই বড় ধরনের আঘাত এসেছে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের সাবেক প্রধান চার্লস মিশেলের কণ্ঠে ঝরল আরও চরম হতাশা। সিএনএনকে তিনি বলেন, ‘দশক ধরে আমরা যে সম্পর্কের কথা জানতাম, তা এখন মৃত।’

মিত্রদের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক বছরের অবজ্ঞা আর অসম্মানের পর অনেকের মনেই প্রশ্ন ছিল, পুরোনো সেই সম্পর্কের আর কতটুকুই–বা অবশিষ্ট আছে? গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে স্পষ্টভাবেই।

একজন ইইউ কূটনীতিক সিএনএনকে বলেন, ‘আপনি যদি গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য এমন মরিয়া হয়ে ওঠেন, তবে কেউই আর বিশ্বাস করবে না যে যুক্তরাষ্ট্র এস্তোনিয়ার মতো মিত্রদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে।’

নতুন পথের সন্ধানে ইউরোপ

ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষার মুখে ইউরোপের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—হয় প্রতিরোধ, নয়তো দাসত্ব। এই কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক এই সপ্তাহে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তোষণ নীতি কোনো ফল দেয় না, কেবল অপমানই বয়ে আনে।

তোষণ নীতি কোনো ফল দেয় না, কেবল অপমানই বয়ে আনে
ডোনাল্ড টাস্ক , প্রধানমন্ত্রী, পোল্যান্ড

অন্যদিকে দাভোস সম্মেলনে বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডি ওয়েভার অনেকটা বিদ্রূপের সুরেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘দুস্থ দাসের’ চেয়ে ‘সুখী অনুগত’ থাকাও শ্রেয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, হোয়াইট হাউসের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এখন তারা স্বাবলম্বী হতে চায়—বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে। ২০২৫ সালজুড়ে ট্রাম্পকে তোষামোদ করার যে নীতি ইউরোপ নিয়েছিল, এখন তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে চাইছেন অনেক নেতা।

দোলাচলে ইউরোপ

ট্রাম্পের হুংকার সত্ত্বেও ইউরোপের সামনে থাকা পুরোনো হুমকিগুলো একবিন্দুও কমেনি। গত সোমবার কিয়েভে চলতি বছরের সবচেয়ে বড় হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। ফিনিশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা সতর্ক করেছে, বাল্টিক সাগরের তলদেশের অবকাঠামো এখন রুশ নাশকতার প্রধান লক্ষ্য। মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের দিক থেকে আসা ঝুঁকিগুলোও আগের মতোই বিদ্যমান।

ইইউ কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপ করে বোঝা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখলের আকাঙ্ক্ষার কাছে নতি স্বীকার করতে কেউ রাজি নন। তবে প্রকাশ্যে সবার প্রতিবাদ সমানভাবে জোরালো ছিল না। এর কারণও স্পষ্ট—রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মোকাবিলায় ইউরোপ এখনো একা লড়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। তাই ট্রাম্পের মতো খামখেয়ালি নেতাকে পুরোপুরি শত্রুতে পরিণত করতে অনেকেই ভয় পাচ্ছেন।

এমনকি গ্রিনল্যান্ড ইস্যু থেকে ট্রাম্প কিছুটা পিছু হটলেও জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসকে দেখা গেছে নমনীয় সুরে কথা বলতে। ইউরোপের বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকির মুখে ট্রাম্পের মত পরিবর্তনের জন্য তিনি ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে বাল্টিক দেশগুলো, যারা সাধারণত বেশ সোচ্চার থাকে, তারাও ট্রাম্পের এমন খিটখিটে মেজাজের সামনে আশ্চর্যজনকভাবে চুপ ছিল।

লিথুয়ানিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোভিল সাকালিন সিএনএনকে বলেন, ‘হোয়াইট হাউসের তৈরি করা এই সংকটের আবেগীয় দিকে নজর না দিয়ে আমাদের উচিত সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিকগুলোতে মনোযোগ দেওয়া। একে অপরের বাস্তবসম্মত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধান করতে হবে।’

সাকালিন আরও মনে করিয়ে দেন, ইউরোপের মাটিতে মার্কিন সামরিক শক্তির সমকক্ষ হতে মহাদেশটির আরও ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে। তাই সংঘাত নয়; বরং ‘সহযোগিতা’ শব্দটির ওপরই এখন জোর দেওয়া উচিত।