
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া অ্যান্ডি বার্নহ্যাম গত সোমবার বিকেলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে ফোন করেন। তিনি তাঁদের মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করার খবর জানান। কিছুক্ষণ পরই সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলির কাছে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে যাওয়ার ডাক আসে।
স্যুট ও লাল টাই পরে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিলি পার্লামেন্টের পেছনের একটি পথ দিয়ে একাই প্রবেশ করেন। হোয়াইট হলের দিকে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে তিনি হালকা হাসি দিয়ে শুধু বলেন, ‘আমি একটি বৈঠকে যাচ্ছি।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই জানা যায়, তাঁকে যুক্তরাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদ অর্থমন্ত্রী হিসেবে জন হিলির নিয়োগের ঘটনায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বেশ সন্তুষ্ট। তাঁদের স্বস্তির জায়গাটি হলো, অর্থ মন্ত্রণালয়ে এখন এমন একজন থাকবেন, যিনি সামরিক ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে আছেন।
লেবার পার্টির সহকর্মীদের কাছে, যুক্তরাজ্যের সাধারণ জনসাধারণের কাছে, এমনকি হিলির নিজের কাছেও এই নিয়োগ ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বার্নহ্যাম একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে জ্বালানি বিলের ওপর ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্তও আছে। এসব পদক্ষেপে এটা স্পষ্ট হয়েছে, নতুন সরকার অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নিতে চায়।
কনজারভেটিভ পার্টি জ্বালানি বিলে ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছে। তবে এই করছাড়ের অর্থায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছে।
মাত্র পাঁচ সপ্তাহ আগে সামরিক ব্যয় নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন জন হিলি। এর মধ্য দিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটের ওপর কিয়ার স্টারমারের নিয়ন্ত্রণ নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল।
শিগগিরই জন হিলি আবার মন্ত্রিসভায় ফিরছেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে এমন আরও দুজন থাকবেন, যাঁদের সাম্প্রতিক পদত্যাগকে কেন্দ্র করে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব চাপে পড়েছিল। তাঁরা হলেন নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এবং নতুন জ্বালানিমন্ত্রী মিয়াট্টা ফানবুলেহ।
তাহলে এই তিনজন কি বিদ্রোহ করে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ক্ষমতায় আসার পথ দ্রুততর করার পুরস্কার পেলেন? খুব সম্ভবত তা–ই হয়েছে।
তবে জটিল দায়িত্ব সামলানোর ক্ষেত্রে তিনজনকেই দক্ষ ও অভিজ্ঞ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সরকারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদ অর্থমন্ত্রী হিসেবে জন হিলির নিয়োগের ঘটনায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বেশ সন্তুষ্ট। তাঁদের স্বস্তির জায়গাটি হলো, অর্থ মন্ত্রণালয়ে এখন এমন একজন থাকবেন, যিনি সামরিক ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে আছেন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র বলেছে, ‘এটা আমাদের জন্য দারুণ খবর।’
তবে একই সূত্র আবার এ নিয়েও স্বস্তি প্রকাশ করেছে, হিলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আর ফিরছেন না।
ওই সূত্রের ভাষায়, ‘আমরা চাইনি তিনি আবার ফিরে (প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে) আসুন। তাঁকে নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম। তিনি কাজের ক্ষেত্রে বেশ কঠিন স্বভাবের একজন।’
কনজারভেটিভ পার্টির কিছু জ্যেষ্ঠ নেতাও জন হিলিকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে বিচক্ষণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন।
কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক মন্ত্রিসভার এক সদস্য বলেন, ‘এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে। তিনি এড মিলিব্যান্ড নন, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করা সহজ নয়। আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম সম্পর্কেও তাঁর ভালো ধারণা আছে।’
টনি ব্লেয়ার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে হিলি টানা পাঁচ বছর অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বার্নহ্যামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী অ্যানেলিজ মিডজিলির সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া সদস্যসহ লেবার পার্টির এমপিদের সরকারের প্রতি অনুগত রাখার দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে।
এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক চিফ সেক্রেটারি ড্যারেন জোনস প্রকাশ্যে বার্নহ্যামের জ্বালানি বিল-সংক্রান্ত নীতির সমালোচনা করেছেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে, দলের সবাই নতুন নেতৃত্বকে সহজভাবে মেনে নিচ্ছেন না।
লেবার পার্টির এক এমপির দাবি, বার্নহ্যাম যাঁদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়েছেন, তাঁদের মোটামুটি তিনটি দলে ভাগ করা যায়।
আগাম নির্বাচন বার্নহ্যামের জন্য নতুন করে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। এতে তিনি আরও উচ্চাভিলাষী নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বৈধতা পাবেন এবং পূর্ণ পাঁচ বছরের জন্য নিজের অবস্থানও আরও শক্ত করতে পারবেন।
ওই এমপি বলেন, ‘কেউ তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাদ পড়েছেন, কেউ কাজের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন না, আর কয়েকজনকে পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির সদস্যরাই অপছন্দ করতেন।’
ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন চলছে, জনমত জরিপে সম্ভাব্য ইতিবাচক ফলের সুযোগ নিয়ে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম আগাম জাতীয় নির্বাচন ঘোষণা দিতে পারেন।
রিফর্ম পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজও আগাম নির্বাচনের পক্ষে। তাঁর যুক্তি হলো, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জনগণের কাছ থেকে সরাসরি কোনো নির্বাচনী ম্যান্ডেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হননি, তাই নতুন নির্বাচন প্রয়োজন।
তবে ফারাজকে একদিকে উপনির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ সামলাতে হচ্ছে। ফলে রিফর্ম পার্টির ভেতরে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, বার্নহ্যাম যদি খুব দ্রুত নির্বাচন ডেকে বসেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগটি ফারাজ হারাতে পারেন।
রিফর্ম পার্টির এক সূত্র হাসতে হাসতে বলে, ‘আমরা সত্যিই আগাম নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আছি। আর সেই কারণেই আমরা আগাম নির্বাচনের দাবিও জানাচ্ছি।’
ওয়েস্টমিনস্টারের সব বড় রাজনৈতিক দলই এখন সম্ভাব্য আগাম নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে নিজেদের প্রস্তুতি শুরু করেছে।
তবে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইঙ্গিত দিয়েছেন, আপাতত তিনি আগাম নির্বাচনে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন না।
এমন সিদ্ধান্ত লেবার পার্টির অনেক এমপিকে স্বস্তি দিতে পারে। কারণ, আগাম নির্বাচন হলে তাঁদের কেউ কেউ নিজেদের আসন হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
অপর দিকে আগাম নির্বাচন বার্নহ্যামের জন্য নতুন করে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। এতে তিনি আরও উচ্চাভিলাষী নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বৈধতা পাবেন এবং পূর্ণ পাঁচ বছরের জন্য নিজের অবস্থানও আরও শক্ত করতে পারবেন।
কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক মন্ত্রিসভার এক সদস্য বলেন, সামনের দিনগুলোতে অর্থনৈতিকভাবে কঠিন সময় আসছে।
কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক মন্ত্রিসভার ওই সদস্য আরও বলেন, ‘বার্নহ্যামের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, তিনি সেই পরিস্থিতির আগেই রাজনৈতিকভাবে কতটা এগিয়ে যেতে পারবেন। তাঁর সামনে দুটি পথ। একটি হলো আগাম নির্বাচন ডাকা, অন্যটি হলো গর্ডন ব্রাউনের সরকারের মতো ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারিয়ে পতনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ২০০৭ সালে আগাম নির্বাচন করার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় সমালোচকেরা তাঁকে ব্যঙ্গ করে ‘বটলার ব্রাউন’ বলে ডাকতে শুরু করেন।
অবশ্য ব্রাউন ধৈর্য, সতর্কতা, রাজনৈতিক কৌশল এবং কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমন্বয়ে শেষ পর্যন্ত ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছেছিলেন।
বিপরীতে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের দ্রুত উত্থানের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে একটি বড় নির্বাচনী ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত। এখন প্রশ্ন হলো মেকারফিল্ডে জয় এবং পরে লেবার পার্টির নেতৃত্বে নির্বাচনে সফল হওয়ার পর বার্নহ্যাম কি আরেকটি বড় রাজনৈতিক বাজি ধরতে চাইবেন?