
জার্মানির নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের জন্ম হয়েছিল ১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল অস্ট্রিয়ার ইন নদীর তীরে ব্রাউনাউ শহরে। জার্মান ভাষায় বলা হয় ব্রাউনাউ আম ইন। সেখানে থাকা হিটলারের জন্মবাড়িটি বেশ কয়েক বছর ধরে সংস্কার করা হয়েছে। এখন সেই বাড়ি রাষ্ট্রের কাজে ব্যবহৃত হবে। আজ বুধবার ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে থানা হিসেবে উদ্বোধন করা হচ্ছে।
একসময় হিটলারের মা–বাবা ওই বাড়িতে ভাড়াটে হিসেবে থাকতেন। তবে হিটলারের জন্মের কয়েক মাস পরই তাঁরা অন্যত্র চলে যান। এরপর ভবনটির ইতিহাস বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়া জার্মান সাম্রাজ্যের অধীন যুক্ত হওয়ার পর নাৎসি পার্টি এনএসডিএপি ভবনটি কিনে নেয়। সেখানে তাদের ‘ফ্যুরার’ বা নেতাকে কেন্দ্র করে তাদের আদর্শের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলে তারা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভবনটি আবার আগের মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে অস্ট্রিয়ান সরকার এটি ভাড়া নেয়। বিভিন্ন সময়ে বাড়িটি গ্রন্থাগার, স্কুল ও সর্বশেষে প্রতিবন্ধী মানুষের কর্মশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে ভবনটি খালি পড়ে ছিল।
২০১৬ সালে অস্ট্রিয়া সরকার ব্যক্তিমালিকানাধীন এই ভবন অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। নব্য-নাৎসিরা যাতে ভবনটি তীর্থস্থান হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য এ ব্যবস্থা। তবু প্রায়ই সেখানে নব্য–নাৎসি ও হিটলার অনুসারীদের আনাগোনা দেখা যেত।
পরে অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘অ্যাডলফ হিটলারের জন্মবাড়িটি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক ব্যবহারের লক্ষ্যে কমিশন’ গঠন করে। এই কমিশনের কাজ ছিল, ভবিষ্যতে ভবনটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরি করা। কমিশন সুপারিশ করে, ভবনটি সামাজিক-কল্যাণমূলক কাজে, নয়তো সরকারি প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা উচিত।
বেশ কয়েক বছর ধরে সংস্কারকাজ চলার পর অ্যাডলফ হিটলারের জন্মবাড়িটি এখন রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। আজ বুধবার ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি থানা হিসেবে উদ্বোধন করা হবে। ভবনটির সংস্কারে প্রায় দুই কোটি ইউরো ব্যয় হয়েছে।
মূল ভবনের পাশাপাশি আশপাশের স্থাপনা, অভ্যন্তরীণ প্রাঙ্গণসহ পুরো এলাকায় স্থানীয় পুলিশ কমান্ড এবং স্থানীয় পুলিশ পরিদর্শনকেন্দ্রের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন ভবনের বাইরের দেয়ালে কোনো তথ্যফলক লাগানো হয়নি।
অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘অ্যাডলফ হিটলারের জন্মবাড়ি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক ব্যবহারের জন্য গঠিত কমিশনের’ সদস্য অস্কার ডয়চে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেছিলেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এই বাড়ি যেন নাৎসিদের তীর্থস্থানে পরিণত না হয়।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, অন্য ধরনের ব্যবহারও সম্ভব ছিল। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখানে এখন একটি গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রের থানা থাকবে, যার অন্যতম দায়িত্ব হলো নাৎসি মতাদর্শের পুনরুত্থানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
কমিশনের আরেক সদস্য, ইতিহাসবিদ অলিভার রাথকোলব বলেন, ‘আমরা সর্বসম্মতিক্রমে প্রথমে ভলকস হিল্পে নামের একটি মানবিক কল্যাণ সংস্থাকে ভবনটি দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়। এখন এখানে থানা থাকায় হিটলার-ভক্তরা পরিবর্তিত এই ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে নিরুৎসাহিত হবে।’
ব্রাউনাউ শহরের নাগরিকদের এ বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। স্থানীয় নাগরিক উদ্যোগ ‘ডিসকুর্স হিটলারহাউস’–এর মুখপাত্র ও ব্রাউনাউয়ের বাসিন্দা এভেলিনে ডল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘এই ইতিহাসের জন্য শহরটি দায়ী নয়। কিন্তু সারা বিশ্বে ব্রাউনাউ চিরকাল সেই শহর হিসেবেই পরিচিত থাকবে, যেখানে মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ গণহত্যাকারীর জন্ম হয়েছিল।’
বিগত বছরগুলোতে অ্যাডলফ হিটলারের জন্মবাড়িটি নব্য-নাৎসিদের সমাগমস্থলে পরিণত হয়েছিল। জার্মানিতে হিটলারের সর্বশেষ নিবন্ধিত ঠিকানা মিউনিখের প্রেঞ্জরেগেন্টেন অ্যালের বাড়িটিও বর্তমানে থানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হিটলারের মৃত্যুর পর ভবনটি বাভারিয়া রাজ্যের মালিকানায় চলে যায় এবং বিভিন্ন সরকারি কাজে ব্যবহৃত হয়।
১৯৯৮ সালে সেই বাড়িতে থানা স্থাপন করা হয়। সম্প্রতি এই থানা নির্দিষ্ট কিছু অনুষ্ঠানের সময় সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে, যাতে দেখানো যায়—একসময় কঠিন ও অন্ধকার অতীতের সঙ্গে জড়িত এই স্থান আজ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।