
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহ চলছে। এই যুদ্ধের কারণে ইউরোপীয় নেতারা এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। একদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পূর্ণমাত্রায় চালু করার জন্য তাঁদের কাছে সাহায্য চাইছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার প্রতি চরম অনীহাও রয়েছে ইউরোপের নেতাদের মধ্যে।
সোমবার ইউরোপের বেশ কয়েকজন নেতা ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বক্তব্যে উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বাধীন এই যুদ্ধ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিলেও ইউরোপীয় অনেক নেতা তাঁদের দেশের নৌবাহিনীকে বিপদের মুখে হরমুজ প্রণালিতে পাঠাতে স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
গত রোববার এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, তেল, গ্যাস ও সারবাহী ট্যাংকারগুলোর জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টায় ইউরোপীয় দেশগুলো যোগ না দিলে তা ন্যাটোর ভবিষ্যতের জন্য খুব খারাপ হবে। এর আগে শনিবার তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, হরমুজ বন্ধ করার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো দ্রুতই সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে।
ইউরোপীয় কর্মকর্তারা বলছেন ঠিক উল্টো কথা। জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস সোমবার বলেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এটি শুরু করিনি।’ তিনি বলেন, জার্মানি কূটনৈতিক সমাধান চায়। আর ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনী পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করছে। তবে তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা রক্ষণাত্মক অবস্থায় থাকবে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাঁর দেশ ইরানের সঙ্গে ‘বিস্তৃত এই যুদ্ধে জড়াবে না।’ ট্রাম্পের মন্তব্য সরাসরি উল্লেখ না করে স্টারমার বলেন, ‘আমার নেতৃত্বের লক্ষ্য হলো ব্রিটিশ স্বার্থে অটল থাকা, যত চাপই আসুক না কেন।’ তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে সম্মিলিতভাবে কী করা যায়, সে বিষয়ে যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা ইউরোপীয় অংশীদারসহ সব মিত্রদের সঙ্গে কাজ করছেন।
ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ এখন বাস্তব। জ্বালানির দাম ইতিমধ্যেই আকাশচুম্বী, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের স্মৃতিও কাজ করছে। বিশ্বনেতারা মনে রেখেছেন, কীভাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের জেদ এবং ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরাকে হামলা চালানো হয়েছিল। এটি ছিল একটি ব্যয়বহুল ভুল।
বর্তমানে ইতালির একটি যুদ্ধজাহাজ ফ্রান্সের একটি বিমানবাহী রণতরির সঙ্গে মাঠে থাকলেও সেগুলোর কার্যক্রম কেবল পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ইউরোপীয় নেতারা এখন উভয়সংকটে রয়েছেন। যদি তাঁরা কিছু না করে চুপচাপ বসে থাকেন, তবে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকবে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাধা আসবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেবে। আবার যদি তাঁরা যুদ্ধে যোগ দেন, তবে সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। এটি ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইউরোপীয় নেতাদের আবার ট্রাম্পের এক পুরোনো অভিযোগও সামলাতে হচ্ছে। অভিযোগটি হলো পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য যথেষ্ট খরচ করে না। রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘কোনো দেশ আমাদের এই ছোট প্রচেষ্টায় সাহায্য করবে না, সেটা দেখাটা বেশ মজার হবে।’
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষাপ্রধান নিক কার্টার বিবিসি রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ন্যাটোর যোগ দেওয়া অনুচিত হবে। ন্যাটো একটি ‘রক্ষণাত্মক জোট’ হিসেবে তৈরি হয়েছিল। এর প্রতিটি ধারা আত্মরক্ষার জন্যই। এটি এমন কোনো জোট নয় যে একটি দেশ নিজের ইচ্ছায় যুদ্ধে যাবে, আর বাকিদের তা অনুসরণ করতে বাধ্য করবে।
পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাডোস্লাভ সিকোরস্কি বলেছেন যে তাঁর দেশের নেতারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাহিনী পাঠানোর বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে প্রাথমিক আক্রমণে অংশ না নেওয়ায় কিয়ার স্টারমারকে বারবার ট্রাম্পের আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আবারও পুরোনো সেই বিষয়টি তুলে ধরে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, এটি ন্যাটোর কোনো অভিযান নয়। আর কখনো সেভাবে ভাবাও হয়নি।’
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানিও তাঁর দেশের নৌবাহিনীকে হরমুজ প্রণালিতে পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। বর্তমানে ইতালির একটি যুদ্ধজাহাজ ফ্রান্সের একটি বিমানবাহী রণতরির সঙ্গে মাঠে থাকলেও সেগুলোর কার্যক্রম কেবল পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
রোববার ইতালির একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আন্তোনিও তাজানি বলেন, ‘আমরা হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযানে যুক্ত নই।’ তিনি আরও বলেন যে ইতালি, ফ্রান্স বা অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জোর করে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রস্তাব দেয়নি।
সেদিনই কুয়েতের আলী আল সালেম ঘাঁটিতে একটি ড্রোন হামলায় ইতালির একটি উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়েছে। ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারাও থাকেন। তবে ইতালির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের কোনো সদস্য আহত হয়নি।
পরদিন সোমবার পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাডোস্লাভ সিকোরস্কি বলেছেন যে তাঁর দেশের নেতারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাহিনী পাঠানোর বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন। হরমুজ প্রণালি নিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের ভেতরে এ বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাটোকে “আমাদের” না বলে “তারা” বা “ইউরোপ” বলে সম্বোধন করছেন। এটি কিছুটা উদ্বেগের।’