
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) চিফ প্রসিকিউটর করিম খানের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করা দুই নারীর একজন প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসেছেন। দুজনই মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের ক্রিস্টিয়ান আমানপোরকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। প্রকাশ্যে আসা আইসিসির ওই কর্মীর নামের প্রথম অংশ সারাহ। চিফ প্রসিকিউটর করিম খানের বিরুদ্ধে সহকর্মীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে চলা আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে তাঁর এই সাক্ষাৎকার।
সারাহ পেশায় আইনজীবী এবং তিনি সরাসরি করিম খানের অধীনে কাজ করতেন। তিনি করিম খানের আচরণকে ‘উদ্দেশ্য হাসিলে একের পর এক চেষ্টা’ চালিয়ে যাওয়া বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘এটি ধীরে ধীরে আমার ব্যক্তিগত সীমানা লঙ্ঘন করার মতো একটি বিষয় ছিল। তিনি শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও আমার ব্যক্তিগত সীমানায় অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন।’
সারাহ অভিযোগ করেন, একবার কলম্বিয়ায় সরকারি সফরের সময় করিম খান তাঁর হোটেলের কক্ষে ঢুকে পড়েন। সে সময় তিনি ঘুমানোর ভান করে পড়ে ছিলেন। ওই অবস্থায় করিম খান তাঁর গায়ে আপত্তিকরভাবে হাত দেন, তাঁকে স্পর্শ করেন।’ তবে করিম খান শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্যাট্রিসিয়া ছদ্মনামের দ্বিতীয় আরেক নারীও সিএনএনের প্রতিবেদক আমানপোরের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে সাক্ষাৎকারের সময় তাঁর মুখমণ্ডল আড়াল করে রাখা হয়েছিল। এই নারী গত বছর প্রথম যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি করিম খানের কর্মজীবনের শুরুর দিকে তাঁর সঙ্গে কাজ করতেন।
প্যাট্রিসিয়া বলেন, ২০০৯ সালে ইন্টার্নশিপ করার সময় তাঁকে করিম খানের বাড়িতে গিয়ে কাজ করতে হতো। তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমি যতবারই সেখানে গিয়েছি, প্রতিবারই তিনি আমার ওপর চড়াও হতেন। তিনি আমাকে জাপটে ধরতেন, আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করতেন, আমার মুখে চুম্বন করতেন এবং চুল হাতড়ে আমাকে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করার চেষ্টা করতেন।’
করিম খানের আইনজীবীদের একজন সারেতা আশরাফ। তাঁর দাবি, এই দুই নারীর আনা অভিযোগগুলো নতুন কিছু নয়। করিম খান শুরু থেকেই এসব অভিযোগ ‘পুরোপুরি’ অস্বীকার করে আসছেন। আমানপোরের সঙ্গে কথা বলার সময় সারেতা বলেন, ‘সব তথ্যপ্রমাণ ও বাস্তবতা আজকের এই অনুষ্ঠানে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার চেয়ে একদম আলাদা।’
সারেতা আশরাফ আরও বলেন, ‘আগামী ২৪ জুলাই অনুষ্ঠেয় ভোটের মাত্র এক সপ্তাহ আগে গণমাধ্যমে এ ধরনের সাক্ষাৎকার দেওয়া হলো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকের এই সিএনএন অনুষ্ঠানে যেসব তথ্যপ্রমাণ ও জবানবন্দি দেখানো হলো, সেগুলো এবং আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইতিমধ্যে সদস্যদেশগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।’
করিম খান এবং আইসিসি—দুপক্ষের জন্য অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল সময়ে এসব সাক্ষাৎকার সামনে এসেছে। প্রসিকিউটর করিম খানকে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করা হবে কি না, তা নিয়ে আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আইসিসির সদস্যদেশগুলো এক নজিরবিহীন ভোটাভুটিতে বসবে।
গত মাসে সারাহর আনা যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সঙ্গে করিম খানের গুরুতর অসদাচরণের সম্পৃক্ততা পায় আইসিসির গভর্নিং বডি। এরপর তারা করিম খানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে এবং তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য বিষয়টি আদালতের ১২৫টি সদস্যদেশের কাছে পাঠিয়েছে।
তবে প্রধান প্রসিকিউটরের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ‘নিয়মবহির্ভূত’।
২০২১ সালে ৯ বছরের মেয়াদে আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের দায়িত্ব পরিচালনার জন্য নির্বাচিত হন করিম খান। এই বিভাগটি মূলত যুদ্ধাপরাধ বা নৃশংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তদন্ত ও বিচারের কাজ করে থাকে। ৩৯ বছর বয়সী সারাহ ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সরাসরি করিম খানের বিশেষ সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন।
মালয়েশিয়ার নাগরিক সারাহ প্রধান প্রসিকিউটর করিম খানের শীর্ষ দলে যোগ দেওয়ার আগে বেশ কয়েক বছর আইসিসির সাধারণ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছিলেন। ২০২৪ সালের শেষভাগে যখন সারাহর আনা অভিযোগের বিশদ বিবরণ প্রথম সামনে আসে, তখন আইসিসির প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এত দিন পর্যন্ত তাঁর পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল।
করিম খানের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময় দাবি করেছেন, এসব অভিযোগ একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। ২০২৪ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে করিম খান গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছিলেন।
করিম খানের সেই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিরোধী কোনো পক্ষ তাঁকে হেয় করতে এই চক্রান্ত করতে পারে বলে করিম খানের প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন। তবে দ্য গার্ডিয়ানের হাতে আসা নথিপত্র অনুযায়ী, করিম খানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক প্রক্রিয়ার তদন্ত করে দেখা গেছে, কোনো গোয়েন্দা সংস্থাসহ তৃতীয় কোনো পক্ষ সারাহকে ‘ব্যবহার’ করছে, এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সারাহ মুসলিম এবং এখনো আইসিসিতে কর্মরত। আমানপোরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি যদি কোনো রাষ্ট্রের গোয়েন্দা এজেন্ট হতাম বা এ নিয়ে সামান্যতম সন্দেহও থাকত, তবে আমাকে অনেক আগেই চাকরিচ্যুত করা হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার সঙ্গে যা ঘটেছে, কেবল সেই কারণেই আমি অভিযোগ করেছি, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়।’