ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের স্লোভিয়ানস্ক শহরের কাছে একটি সড়ককে ড্রোন প্রতিরোধী জাল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ২৭ অক্টোবর, ২০২৫
ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের স্লোভিয়ানস্ক শহরের কাছে একটি সড়ককে ড্রোন প্রতিরোধী জাল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ২৭ অক্টোবর, ২০২৫

চীনে গোপনে প্রশিক্ষণ নিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে ফিরেছেন রুশ সেনারা: ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থা

  • চীনের সেনাবাহিনী গত বছরের শেষ দিকে গোপনে প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে চীনে প্রশিক্ষণ দিয়েছে

  • প্রশিক্ষণের পর তাদের কিছু অংশ ইউক্রেন যুদ্ধে ফিরে গেছে বলে ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে

  • প্রশিক্ষণের মূলে ছিল ড্রোন ব্যবহার ও কৌশলগত যুদ্ধ প্রশিক্ষণ

  • চীন দাবি করেছে, তারা ইউক্রেন ইস্যুতে নিরপেক্ষ অবস্থানে আছে এবং শান্তি আলোচনায় কাজ করছে

  • ইউরোপীয় দেশগুলো চীন-রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে

চীনের সেনাবাহিনী গত বছরের শেষ দিকে গোপনে প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। চীনেই এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রুশ সেনাদের একটা অংশ যুদ্ধ করতে ইউক্রেনে ফিরে যায়। তিনটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথি ঘেঁটে রয়টার্স এসব তথ্য জানতে পেরেছে।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়া পূর্ণমাত্রায় হামলা শুরু করার পর থেকে বেইজিং ও মস্কো একাধিক যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে। তবে বেইজিং বারবার বলেছে, এই যুদ্ধে তাদের অবস্থান নিরপেক্ষ। চীনের দাবি, তারা দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।

চীনে রুশ সেনাদের গোপনে দেওয়া এই প্রশিক্ষণে মূলত ড্রোন ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২ জুলাই বেইজিংয়ে রুশ ও চীনা সামরিক কর্মকর্তাদের সই করা রুশ-চীনা দ্বিভাষিক এক চুক্তিতে বিষয়টি উল্লেখ করা ছিল। রয়টার্স ওই চুক্তিসংক্রান্ত নথি দেখতে পেয়েছে।

চুক্তিতে বলা ছিল, প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে বেইজিং ও পূর্বাঞ্চলীয় শহর নানজিংসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সূত্রগুলো বলছে, পরে প্রায় একই সংখ্যক সেনা চীনে প্রশিক্ষণ নেন।

চুক্তিতে আরও বলা হয়, কয়েক শ চীনা সেনাকেও রাশিয়ার সামরিক স্থাপনাগুলোতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ইউক্রেনে অংশ নেওয়া রুশ সেনাদের অভিযান পরিচালনা ও কৌশলগত প্রশিক্ষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে চীন ইউরোপীয় মহাদেশের এই যুদ্ধে আগের চেয়ে অনেক বেশি সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে।

এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রাশিয়া ও চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে রয়টার্সকে তথ্যগুলো দিয়েছে।

ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর ২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডের এক সেনা রাশিয়ার হামলার মধ্যে দোনেৎস্ক অঞ্চলের কোস্তিয়ান্তিনিভকা শহরের একটি সড়কের ওপর ড্রোন-প্রতিরোধী জাল স্থাপন করছেন। ২৭ অক্টোবর, ২০২৫

রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইউক্রেন সংকটের ক্ষেত্রে চীন সব সময়ই নিঃস্বার্থ ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং শান্তি আলোচনায় কাজ করছে। এটি ধারাবাহিক ও স্পষ্ট অবস্থান, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও দেখেছে।

মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা না বাড়ানো বা দোষ না চাপানো।

যেসব ইউরোপীয় দেশ রাশিয়াকে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে, তারা উদ্বেগের সঙ্গে মস্কো ও বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে নজর রাখছে। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সহযোগী।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার কয়েক দিন আগে চীন ও রাশিয়া ‘সীমাহীন’ কৌশলগত অংশীদারি ঘোষণা করেছিল। তারা দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য যৌথ সামরিক মহড়া চালানোর অঙ্গীকারও করেছিল। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়াকে একঘরে করার চেষ্টা করেছিল। চীন তখন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল, গ্যাস ও কয়লা কিনে দেশটির অর্থনীতিকে সচল রাখে।

এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখন চীন সফরে আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফর করার এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে এই সফর হচ্ছে। এটি চীনে পুতিনের ২৫তম সফর।

চীন ও রাশিয়া পুতিনের এই সফরকে ‘সব পরিস্থিতিতে’ পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছে। যদিও পশ্চিমা দেশগুলো চাইছে, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে রাশিয়াকে চীনের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হোক।

ড্রোন যুদ্ধ

ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

উভয় পক্ষই দীর্ঘ পাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে শত শত মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। আর যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্ফোরকবাহী ছোট আকারের ড্রোন আকাশ নিয়ন্ত্রণ করছে। পাইলটরা দূর থেকে এ ধরনের ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করেন। এ ধরনের ড্রোনের কারণে ট্যাংক বা পদাতিক সেনাদের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চীনের বেসরকারি কিছু কোম্পানির বিশেষজ্ঞরা রাশিয়ার একটি ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য সামরিক ড্রোনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তখন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, এ ধরনের সহযোগিতার বিষয়ে তারা কিছু জানে না।