নতুন বসতি ‘মালে আরুগোত’–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একটি ইসরায়েলি পরিবারের সদস্যরা। পশ্চিম তীরের গুশ এতজিয়নে, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নতুন বসতি ‘মালে আরুগোত’–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একটি ইসরায়েলি পরিবারের সদস্যরা। পশ্চিম তীরের গুশ এতজিয়নে, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসরায়েলি বসতির সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য

অবৈধ ইসরায়েলি বসতির সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড মঙ্গলবার (আজ) এ নিষেধাজ্ঞার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

হোয়াইট হলের সূত্রের বরাতে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, অবৈধ ইসরায়েলি বসতি নিয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নির্দেশনা দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। এখন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্য সেটা মেনে চলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আইসিজের ওই নির্দেশনায় ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলদারত্বকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এতে যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশকে বসতি স্থাপনের বিরোধিতা করে পদক্ষেপ নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছিল।

ওই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য এখন যুক্তরাজ্য সরকারের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার আওতায় অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর ব্যবসায়িক খাতে যেকোনো ধরনের বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করা হতে পারে।

অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের জন্য নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ সোমবার বলেন, সব দেশেরই বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তারা এ পরিস্থিতিকে (বসতি স্থাপন) বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। এটি শুধু পছন্দের বিষয় নয়। এটি টিকিয়ে রাখতে কোনো সহযোগিতাও করা যাবে না।

ফ্রান্সেসকা আলবানিজ আরও বলেন, অবৈধ বসতির সঙ্গে বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নীতির ক্ষেত্রে একটি ‘প্রকৃত পরিবর্তনের’ অংশ হতে হবে। মূল লক্ষ্য হতে হবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা।

গ্রীষ্মের ছুটি শেষে মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট, লন্ডন, যুক্তরাজ্য, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লেবার মুসলিম নেটওয়ার্ক (এলএমএন) ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব জাস্টিস ফর প্যালেস্টিনিয়ানস (আইসিজেপি) গত সপ্তাহে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্রিটিশ নাগরিক বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিতে যাতে অর্থনৈতিক আর আর্থিক কার্যক্রম চালাতে না পারে, সে জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের ‘পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করা উচিত। সেই সঙ্গে অবৈধ বসতির অর্থনীতিকে সহায়তা করে এমন কোনো কাজ করতে দেওয়াও ঠিক হবে না।
এতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের শুধু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি সম্মান দেখালেই চলবে না, বরং জেনেভা সনদের আওতায় যেকোনো পরিস্থিতিতে এর প্রতি সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।

জেরুজালেমের পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলিদের নতুন ই-ওয়ান বসতি স্থাপনের প্রকল্প নিয়ে বেশ আলোচনা–সমালোচনা চলছে। এ প্রকল্প অধিকৃত পশ্চিম তীরকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করতে চলেছে বলে মত বিশ্লেষকদের। ঠিক এমন একটি সময়ে যুক্তরাজ্য সরকারের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি সামনে এল।

সম্ভাব্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এরই মধ্যে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাজ্য যদি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কাজ করে, তাহলে ইসরায়েলও দেশটির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ছে

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বড় ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে ইঙ্গিত দেন, বিরোধপূর্ণ ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাজ্যের নয়; বরং আর্জেন্টিনার।

ইয়ার নেতানিয়াহু ইসরায়েলের কোনো মন্ত্রী নন, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদও নন। তারপরও ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ইয়ারের মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে ওয়াশিংটন তাদের অবস্থান আবার ভেবে দেখতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার জিবি নিউজকে ট্রাম্প বলেন, আর্জেন্টিনা যদি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে আক্রমণ করে বসে, সেই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যকে সমর্থন করবেন না তিনি। ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে আরও বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যখন ইরানের ভূখণ্ডে হামলা শুরু করেছিল, তখন আপনাদের দেশ আমাকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেনি।’

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের ইউরোপীয় সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে সম্প্রতি কড়া অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, দ্বীপপুঞ্জে তাঁর দেশের ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত’ হয়েছে। মিলেই বলেন, তাঁর দেশ সর্বশক্তি দিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে।

জাতির উদ্দেশে গত শুক্রবার সকালে দেওয়া ভাষণে হাভিয়ের মিলেই বলেন, যেসব তেল কোম্পানি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের চারপাশে খনন করতে চাইবে, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। বর্তমানে আর্জেন্টিনার দাবির পক্ষে সেখানে ‘পরিবর্তনের হাওয়া’ বইছে।

এর আগে গত এপ্রিলে ফাঁস হওয়া পেন্টাগনের একটি মেমো থেকে জানা যায়, লন্ডনের সঙ্গে দর–কষাকষিতে ফকল্যান্ডকে ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে ওয়াশিংটন।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া

এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে অবৈধ ইসরায়েলি বসতির বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য।

এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড গত সপ্তাহের শেষের দিকে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি মাত্র একটি বৈঠক থেকে বের হলাম। যাঁরা গাজায় গিয়েছেন এবং এখনো সেখানে সরাসরি কাজে যুক্ত আছেন; তাঁদের সঙ্গে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বললাম। সত্যি বলতে, সেখানে যা ঘটছে সেটা ভয়াবহ।’

দৃঢ় কণ্ঠে এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড আরও বলেন, ‘যুক্তরাজ্য সরকারকে, যেমনটা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগের চেয়ে জোরালোভাবে কাজ করতে হবে।’

ধাতব বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছেন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। পাশে উড়ছে ইসরায়েলের পতাকা। অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে, ২৯ আগস্ট ২০২৬

প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েলও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে মিলিব্যান্ডের সমালোচনা করা হয়েছে। সেখানে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে বলা হয়, ‘রাজনৈতিক দর্শকদের জন্য ভিডিও বানানোর সময় সত্যের দাম কমই থাকে।’

ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই পোস্ট শেয়ার করে লেখেন, ‘ব্রিটিশরা পাগল হয়ে গেছে। যুক্তরাজ্য সরকারের ইহুদিবিদ্বেষ সীমা ছাড়িয়েছে এবং তারা কোনো সত্য মানছে না।’

উল্লেখ্য, এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড নিজেও একজন ইহুদি। মিলিব্যান্ডের মা ও বাবা হলোকাস্টে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের ওপর চালানো হত্যাযজ্ঞ) পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন।