সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামরেন
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামরেন

যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিটের পর এক দশকে কতজন প্রধানমন্ত্রী বিদায় নিলেন

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণার মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে বিরল এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে মাত্র এক দশকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা ছাড়তে বা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বেশি নেতৃত্ব পরিবর্তনের নজির দেখা যায়নি।

যুক্তরাজ্যের রাজনীতির এই অস্থিরতার সূচনা হয় ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের ফলাফলকে কেন্দ্র করে। এর পর থেকে প্রায় প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীই কোনো না কোনো রাজনৈতিক সংকট, দলীয় বিদ্রোহ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় কিংবা নির্বাচনী ব্যর্থতার কারণে বিদায় নিয়েছেন।

ডেভিড ক্যামেরন: ব্রেক্সিট গণভোটেই পতন

এই ধারার শুরু হয় ২০১৬ সালের ১৩ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। তিনি ২০১০ সালের ১১ মে প্রধানমন্ত্রী হন এবং টানা ৬ বছর ২ মাস ২ দিন দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ব্রেক্সিট গণভোটে ভোটাররা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায় দেন। গণভোটের ফল প্রকাশের পরদিনই ক্যামেরন ঘোষণা দেন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের জন্য নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে

থেরেসা মে: ব্রেক্সিট অচলাবস্থার শিকার

ডেভিড ক্যামেরনের উত্তরসূরি হিসেবে ২০১৬ সালের ১৩ জুলাই দায়িত্ব নেন থেরেসা মে। তিনি ছিলেন যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই পদত্যাগের আগপর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন ৩ বছর ১১ দিন।

ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে করা থেরেসার চুক্তি তিনবার যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে প্রত্যাখ্যাত হয়। দলীয় বিদ্রোহ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিদায় নিতে হয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন

বরিস জনসন: কেলেঙ্কারিতে পতন

২০১৯ সালের ২৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন আলোচিত রাজনীতিবিদ বরিস জনসন। ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া শেষ করা এবং একই বছরের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তা বেশি দিন টেকেনি।

কোভিড লকডাউনের সময় ডাউনিং স্ট্রিটে পার্টি আয়োজন নিয়ে ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারি, একের পর এক মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং নিজ দলের পার্লামেন্ট সদস্যদের (এমপি) আস্থা হারানোর ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব ছাড়ার আগপর্যন্ত তিনি ৩ বছর ১ মাস ১৩ দিন ক্ষমতায় ছিলেন।

স্বল্পস্থায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস

লিজ ট্রাস: ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী

বরিস জনসনের উত্তরসূরি হিসেবে ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেন লিজ ট্রাস। কিন্তু তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব স্থায়ী হয় মাত্র ৪৯ দিন। ক্ষমতায় এসে তিনি কর কমানো ও ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে তথাকথিত ‘মিনি বাজেট’ ঘোষণা করেন। ফলে আর্থিক বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, পাউন্ডের মূল্য রেকর্ড হারে পড়ে যায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত নিজ দলের সমর্থন হারিয়ে ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর তিনি পদত্যাগ করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক

ঋষি সুনাক: নির্বাচন পরাজয়ের দায়ে বিদায়

ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাক ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি দায়িত্বে ছিলেন ১ বছর ৮ মাস ১০ দিন। ট্রাস সরকারের পর অর্থনীতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করলেও মূল্যস্ফীতি, অভিবাসন, এনএইচএস সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত থাকে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির ঐতিহাসিক পরাজয়ের পর তিনি দায়িত্ব ছাড়েন।

এই পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীর সবাই কনজারভেটিভ পার্টির ছিলেন। ব্রেক্সিট উদ্যোগের শুরু হয়েছিল কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সময়।

কিয়ার স্টারমার: ভূমিধস বিজয়ের পর দলীয় চাপ

২০২৪ সালের ৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী হন কিয়ার স্টারমার। এর আগে ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল থেকে তিনি লেবার পার্টির নেতা ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রায় ১ বছর ১১ মাস দায়িত্ব পালন করেন।

সর্বশেষ বিদায়ের পথে লেবার–দলীয় প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার

২০২৪ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এলেও সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে হতাশাজনক ফলাফল, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট, সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং দলীয় অসন্তোষ তাঁর অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।

অবশেষে আজ ২২ জুন সোমবার স্থানীয় সময় সকালে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দেওয়া এক বক্তব্যে স্টারমার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণা দেন।

অতীতে কী এমন ঘটনা ঘটেছে

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেতৃত্ব পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। তবে এত দ্রুত ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের নজির বিরল। ১৯৭৯ সালের ৪ মে মার্গারেট থ্যাচার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০১৬ সালের ১৩ জুলাই ডেভিড ক্যামেরনের বিদায় পর্যন্ত প্রায় ৩৭ বছরে যুক্তরাজ্যে মাত্র পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই কজন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ছিলেন জন মেজর, টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউন। প্রায় চার দশকে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ব্রেক্সিট-পরবর্তী মাত্র এক দশকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী বিদায় নিয়েছেন। এই পরিসংখ্যানই ব্রিটিশ রাজনীতির বর্তমান অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন।

এই অস্থিরতা কী ইঙ্গিত দিচ্ছে

ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্য এখনো তার নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য খুঁজে পায়নি। ব্রেক্সিট, কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, অভিবাসন সংকট, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন—সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি চাপের মধ্যে পড়ছেন।

আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে ধৈর্য কমে যাওয়া। আগে একজন প্রধানমন্ত্রীকে ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার জন্য দীর্ঘ সময় দেওয়া হতো। এখন জনসমর্থন কমলেই, নির্বাচনে খারাপ ফল এলেই বা দলীয় এমপিদের আস্থা হারালেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি উঠছে। ফলে যুক্তরাজ্য এখন এমন এক রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে নির্বাচনে জেতা যতটা কঠিন, ক্ষমতায় টিকে থাকাটা তার চেয়ে আরও বেশি কঠিন।

কিয়ার স্টারমারের বিদায়ের পর যুক্তরাজ্য এখন এক দশকের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রীর অপেক্ষায়। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহামের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও, তিনি বা পরবর্তী যিনিই দায়িত্ব গ্রহণ করুন না কেন, তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিকে আবার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনা।