গবেষণা

মানবজীবনের সব পর্যায়ে বায়ুদূষণের নেতিবাচক প্রভাব

মানবজীবনের প্রতিটি ধাপে বায়ুদূষণের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে
প্রতীকী ছবি: রয়টার্স

ভ্রূণের বিকাশ ও কৈশোরকালীন বুদ্ধিমত্তা থেকে বার্ধক্যকালীন মানসিক স্বাস্থ্য—মানবজীবনের প্রতিটি ধাপে বায়ুদূষণের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। ১০ বছরের বিভিন্ন গবেষণায় বায়ুদূষণের এই ক্ষতিকর দিক উঠে এসেছে।

সারা বিশ্বে হওয়া বায়ুদূষণসংক্রান্ত ৩৫ হাজারের বেশি গবেষণার ফলাফল সমন্বয় করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ গ্রুপ বায়ুদূষণের এক দশকের বৈজ্ঞানিক গবেষণার এই পর্যালোচনা প্রতিবেদন গতকাল সোমবার প্রকাশ করে।

লন্ডনের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউকে কমিটি অন দ্য মেডিকেল ইফেক্টস অব এয়ার পলিউশন, রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস, হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট ও ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের গবেষণা ফলাফলগুলো দেখেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণার সবচেয়ে নতুন গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলটি হলো মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিমেনশিয়াসহ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব ও জীবনের শুরুর দিকে এর প্রভাব, যা মানুষকে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে—এ দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে আরও বলা হয়, উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে, যদিও বর্তমানে অনির্দিষ্ট পরিমাণে সমাজ ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নতুন গবেষণা পর্যালোচনায় বায়ুদূষণের সঙ্গে নবজাতকের প্রথম দিকের সপ্তাহগুলোর স্বাস্থ্য, জন্মের সময়কার ওজন, গর্ভপাত ও মৃত সন্তানপ্রসবের সঙ্গে যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিশ্বাসের সময় একজন মা দূষিত বায়ুকণা গ্রহণ করলে ভ্রূণ দুর্বল হতে পারে, যা ভ্রূণের বিকাশের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। দূষণের সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিকগুলো গর্ভবতী মায়ের রক্তে প্রবেশ করতে পারে ও এর প্রবাহকে পরিবর্তন করতে পারে, যা ভ্রূণের বৃদ্ধিকে ধীর বা বিলম্বিত করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর দুই কোটির বেশি শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। দেড় কোটি শিশু অপরিণত জন্মগ্রহণ করে। অবশ্য প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব শুধু মায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকা পুরুষদের মধ্যে শুক্রাণুর পরিমাণ কম দেখা যায়।

একই সঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আরেকটি গবেষণায় বলা হয়, ‘দূষিত বায়ুকণার সংস্পর্শ’ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় ও স্বভাবজাত বুদ্ধিমত্তা হ্রাস ত্বরান্বিত করে।

সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোয় আরও দেখা যায়, বায়ুদূষণ শিশুদের ফুসফুসের বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে, তাদের রক্তচাপকে প্রভাবিত করতে পারে এবং তাদের স্বভাবজাত বুদ্ধিমত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করতে পারে।

ইম্পিরিয়াল কলেজের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ৮ ও ৯ বছর বয়সী ২ হাজার শিশুর ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে একটি শিশু তাদের প্রত্যাশিত ফুসফুসের পরিমাণের প্রায় ৫ শতাংশ হারিয়েছে, কারণ তারা দূষিত বায়ুতে নিশ্বাস নেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নাইট্রোজেন অক্সাইডের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে খুব সম্ভবত এই প্রভাবের যোগসূত্রতা রয়েছে। ডিজেল পোড়ানোর কারণে এই গ্যাস ছড়িয়ে থাকে।

বায়ুদূষণ হাঁপানি রোগের কারণ বলেও এই প্রতিবেদনে বলা হয়। ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চালানো এক সমীক্ষার আনুমানিক হিসাবে বলা হয়েছে, লন্ডনের খারাপ বায়ুমানের কারণে হাঁপানি ও ফুসফুসের গুরুতর অবস্থা নিয়ে ১৭ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হাঁপানি নিয়ে রাজধানীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর ৭ শতাংশই ছিল শিশু।

পর্যালোচনা প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, বায়ুদূষণের সংস্পর্শে হৃদ্‌রোগে মৃত্যু, স্ট্রোকের ঝুঁকি ও পরবর্তী জীবনে কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

একটি ইউরোপীয় সমীক্ষায় ১০ বছরের মধ্যে প্রায় ১ লাখ লোকের স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়া পর্যালোচনা করে দেখা হয়। এতে পিএম২.৫-এর দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ এবং বিশেষ করে ৬০ বছরের বেশি বয়সী লোকেদের স্ট্রোকের মধ্যে যোগসূত্রতার কিছু তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে। পিএম২.৫ খুব ছোট দূষিত বায়ুকণা, যা নাক ও গলা ছাড়িয়ে শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে।