ইতালির পার্লামেন্টের একটি অধিবেশনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি। ১১ মার্চ ২০২৬
ইতালির পার্লামেন্টের একটি অধিবেশনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি। ১১ মার্চ ২০২৬

মেলোনিকে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের জেরে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল

ইতালির একটি সংবাদমাধ্যমে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা মন্তব্যের জেরে কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের প্রতিবাদে শুক্রবার নিজের যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি। ওই সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে তাঁর বৈঠক করার কথা ছিল। তাজানি ট্রাম্পের ওই মন্তব্যকে ‘অপমানজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে মেলোনি বলেছেন, ট্রাম্পের কথাগুলো ‘সম্পূর্ণ বানোয়াট’।

একসময়ের ঘনিষ্ঠ এ দুই নেতার (ট্রাম্প ও মেলোনি) সম্পর্ক দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। নতুন এ ঘটনা তারই সর্বশেষ উদাহরণ। চলতি সপ্তাহে ফ্রান্সে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সম্পর্ক কিছুটা জোড়া লাগার ইঙ্গিত মিলেছিল। তবে ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের জেরে সম্পর্কের ক্ষত আরও বাড়ল।

ইতালির লা৭ টিভিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, জি-৭ সম্মেলনে মেলোনি তাঁর সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য ‘মিনতি’ করেছিলেন। ট্রাম্প বলেন, তাঁর মায়া লেগেছিল বলেই তিনি ছবি তুলতে রাজি হয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমটিতে ইতালীয় ভাষায় সম্প্রচারিত ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

শুক্রবার সকালে পোস্ট করা একটি ভিডিও বার্তায় ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন মেলোনি। তিনি বলেন, তাদের ‘তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়া প্রয়োজন’।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা ওই ভিডিওতে মেলোনি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথাগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট। আমি সত্যি বলতে খুবই অবাক হয়েছি। আমি জানি না মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেন নিজের মিত্রদের সঙ্গেই এমন আচরণ করেন। আর এমন ঘটনা এবারই প্রথম নয়।’

মেলোনি আরও বলেন, ‘আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, এটা সত্যিই লজ্জার বিষয় যে তিনি (ট্রাম্প) পশ্চিমা দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের বেলায় এমন কঠোরতা দেখাতে পারেন না। বরং সেসব দেশের নেতাদের সঙ্গে তাঁকে অনেক বেশি আপস করতে দেখা যায়।’

জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এভিয়ান-লে-বেঁ, ফ্রান্স। ১৭ জুন ২০২৬

মেলোনি আরও বলেন, ‘তবে আপনাদের একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে. ইতালি ও আমি কখনোই কারও কাছে মিনতি করি না।’

আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানির যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল। মিয়ামিতে ‘ইতালি-যুক্তরাষ্ট্র ব্যবসা, বিনিয়োগ, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন ফোরাম’-এ তাঁর যোগ দেওয়ার কথা ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতি অনুযায়ী, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতেই তাজানির সঙ্গে রুবিওর বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সিএনএন।

ট্রাম্প ও মেলোনির মধ্যে এ ধরনের বিরোধ এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে এ দুই নেতার মধ্যে প্রকাশ্য দ্বিমত ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল।

চলতি বছরের শুরুর দিকে এ দুই ডানপন্থী নেতার মধ্যে বড় ধরনের বাগ্‌যুদ্ধ হয়। ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করায় ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ চতুর্দশ লিওর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের সেই মন্তব্যকে সে সময় ‘অনভিপ্রেত ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী। এরপরই মেলোনির ওপর চটে যান ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাল্টা আক্রমণ করে মেলোনিসহ সামগ্রিকভাবে ইতালির কড়া সমালোচনা করেন। ট্রাম্পের দাবি ছিল, ইরান সংঘাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত সহায়তা করতে ব্যর্থ হয়েছে ইতালি।

পশ্চিম ইউরোপে ট্রাম্পের সবচেয়ে কট্টর মিত্র হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত মেলোনি। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে মেলোনির অস্বীকৃতির কারণে তাঁদের এই সম্পর্কে চিড় ধরেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকেই রক্ষণশীল মেলোনি ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টাদের বিশেষ নজর কাড়তে সক্ষম হন। এমনকি ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া একমাত্র ইউরোপীয় নেতা ছিলেন মেলোনি।

কঠোর অভিবাসন নীতি ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো বিষয়গুলোতে এ দুজনের মধ্যে মিল রয়েছে।

ট্রাম্পকে অতীতে মেলোনির অনেক প্রশংসা করতে দেখা গেছে। অন্যান্য ইউরোপীয় নেতার প্রতি ট্রাম্পের যে বৈরী বা শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব দেখা যায়, মেলোনির ক্ষেত্রে তা ছিল একেবারেই ভিন্ন।