
যুক্তরাজ্যের ইয়র্কশায়ার উপকূলে প্রায় ৬০ বছর পর ধরা পড়েছে একটি বিশালাকারের আটলান্টিক ‘ব্লুফিন’ টুনা।
অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে এবং হেরিং মাছের ঝাঁক কমে যাওয়ায় ১৯৬০-এর দশকের পর থেকে নর্থ সি-তে ব্লুফিন টুনার আনাগোনা বন্ধ হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তাঁরা সম্প্রতি হুইটবি উপকূল থেকে ছয়টি ব্লুফিন টুনা মাছের শরীরে ট্যাগ লাগিয়েছেন।
গত রোববার ‘দ্য ডমিনেটর’ নামের একটি মাছশিকারি নৌকা ৩৩৮ কেজি ওজনের দৈত্যাকার একটি ব্লুফিন টুনা মাছ নিয়ে তীরে ভেড়ে।
নৌকাটির পাঁচ ক্রুর একজন জ্যাক গার্ডনার। তিনি বলেন, পরে তাঁরা আগেরটির চেয়ে সামান্য ছোট আকারের আরেকটি ব্লুফিন টুনা ধরেছেন।
২৮ বছর বয়সী গার্ডনারের বাড়ি নর্থ সি উপকূলের বন্দরনগরী হালের কাছের পল গ্রামে। তিনি বলেন, ‘এর আগে আমি কখনোই এমন কিছু ধরিনি।’ এই অভিজ্ঞতাকে তিনি তাঁর ‘জীবনের সেরা অনুভূতি’ বলে বর্ণনা করেছেন।
২০১৮ সাল থেকে ‘দ্য ডমিনেটর’ নৌযানে করে সমুদ্রে মাছ ধরতে যান গার্ডনার। তিনি বলেন, গত রোববার প্রথম মাছটি ধরার সময় তাঁদের নৌযানটি হুইটবি হারবার থেকে প্রায় ১০ মাইল (১৬ কিলোমিটার) দূরে ছিল।
গার্ডনার বলেন, ‘মাছটি পানি থেকে লাফিয়ে উঠেছিল, আর আমরা সবাই বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমরা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, সত্যিই আমরা এমন একটি মাছকে বড়শিতে আটকাতে পেরেছি।’
গার্ডনারদের মাছ ধরার দলটি সমুদ্রে যেখানে টুনা মাছ দুটি পেয়েছে, সেখানে পরিযায়ী প্রজাতির মাছ দেখতে পাওয়া গেছে বলে তাঁরা শুনেছিলেন।
১৯৩৩ সালে হুইটবিতে ৩৮৬ কেজি ওজনের একটি টুনা মাছ ধরে পড়েছিল। যুক্তরাজ্যে এটিই এখন পর্যন্ত ধরা পড়া সবচেয়ে বড় টুনা মাছ। পরে নানা কারণে যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল টুনা মাছের আনাগোনা কমে যায় এবং একসময় সেগুলোর দেখা আর মিলত না।
গার্ডনার আরও বলেন, ‘আমরা যখন বাড়ির দিকে ফিরছিলাম, ঠিক তখন একঝাঁক পাখি দেখতে পাই। তাই সেখানে গিয়ে আশপাশে একটু খোঁজাখুঁজি করার চেষ্টা করি। আর তখনই একটি মাছ আমাদের বড়শিতে আটকে যায়। আমরা জানতাম, এসব মাছ এই জলসীমায় আছে। কিন্তু প্রশ্ন ছিল, আমরা এগুলো ধরতে পারব কি না। কারণ, এগুলো খুব দ্রুতগতির মাছ।’
গত বছর দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের সমুদ্রসীমায় ধরা পড়া ২১০ কেজি ওজনের একটি ব্লুফিন টুনা মাছ নিলামে ২ হাজার পাউন্ডের বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল।
গার্ডনারদের নৌকা হুইটবি হারবারে ফিরে আসার আগেই তাঁদের ধরা ৩৩৮ কেজির মাছটি বিক্রি হয়ে যায়। পরদিন তাঁরা আরও একটি ব্লুফিন টুনা ধরেন। সেটির ওজনও ৩০০ কেজির বেশি ছিল।
‘হুক টু প্লেট’ নামের একটি মাছ বিক্রিকারী প্রতিষ্ঠান প্রথম টুনা মাছটি কিনে নিয়েছে। তাদের কর্মকর্তা ল্যান্স ভারেল বলেন, মাছটি ‘ভালো মানের’এবং এগুলো রেস্তোরাঁ, সুশির বাজার ও সরাসরি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হবে।
ভারেল আরও বলেন, অভিজাত্যের প্রতীক এবং অত্যন্ত দামি মাছ হিসেবে ব্লুফিন টুনা খুবই জনপ্রিয়। এটিকে তাই সমুদ্রের ‘রোলস রয়েস’ বলা হয়। লন্ডনে কর্মরত জাপানি রাঁধুনিরা যদি এটিকে খুব ভালো মানের মনে করেন, তবে তাঁরা প্রতি কেজি ১০০ পাউন্ড পর্যন্ত দামে এটি কিনে নেবেন।
১৯৩৩ সালে হুইটবিতে ৩৮৬ কেজি ওজনের একটি টুনা মাছ ধরে পড়েছিল। যুক্তরাজ্যে এটিই এখন পর্যন্ত ধরা পড়া সবচেয়ে বড় টুনা মাছ।
পরে নানা কারণে যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল টুনা মাছের আনাগোনা কমে যায় এবং একসময় সেগুলোর আর দেখা মিলত না।
মাছটি পানি থেকে লাফিয়ে উঠেছিল, আর আমরা সবাই বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমরা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে সত্যিই আমরা এমন একটি মাছকে বড়শিতে আটকাতে পেরেছি।জ্যাক গার্ডনার, মৎস্যশিকারি
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল ব্লুফিন টুনা মাছ আবার ফিরে এসেছে।
গবেষণাটির নেতৃত্বদানকারী ড. লুসি হকস যুক্তরাজ্যের জলসীমায় ব্লুফিন টুনা মাছের ফিরে আসার কারণ হিসেবে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় কিছু সতর্ক ও বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনাকে কৃতিত্ব দিয়েছেন।
তবে এই গবেষক সতর্ক করে বলেন, ‘ব্লুফিন টুনা মাছ সমুদ্রে খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষ শিকারি। তাই তাদের নিচে থাকা জলজ বাস্তুতন্ত্র সুস্থ থাকলেই কেবল তারা এসব জলসীমায় থাকতে পারে। মূলত তাদের উপস্থিতি আপনার জলসীমার বাস্তুতন্ত্র ভালো অবস্থায় আছে, তার প্রমাণ। তবে তারা কোথা থেকে এসেছে, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। আর এ কারণেই ট্যাগ লাগানো এত গুরুত্বপূর্ণ।’
২০১৮ সাল থেকে এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও জার্সির আটলান্টিক উপকূল থেকে ১৬৫টি ব্লুফিন টুনা মাছের শরীরে ট্যাগ লাগিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, হুইটবি উপকূলের কাছে পাওয়া মাছগুলো আগেই ট্যাগ লাগানো মাছগুলোর তুলনায় ‘অনেক বেশি বড়’ এবং এগুলো জিনগতভাবেও ভিন্ন।
ট্যাগ লাগানো হলে প্রতিদিন মাছগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করা সম্ভব হয় বলে জানান তিনি। লুসি হকস বলেন, ‘আগামী এক-দুই বছরে তারা কী করে, তা আমাদের দেখতে হবে। এর মাধ্যমে এসব মাছ আসলে কোথা থেকে এসেছে এবং এগুলো সম্পর্কে আরও তথ্য জানা যাবে।’