যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি জানিয়েছেন, নতুন এই প্রকল্পে ১৫ কোটি পাউন্ড দেবে যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি জানিয়েছেন, নতুন এই প্রকল্পে ১৫ কোটি পাউন্ড দেবে যুক্তরাজ্য

ডুবোড্রোন প্রযুক্তি তৈরি করবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া

‘অকাস’ জোটের অধীন ডুবোড্রোন প্রযুক্তি তৈরি করবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া। সমুদ্রের তলদেশের কেব্‌ল রক্ষা ও নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে তারা এ উদ্যোগ নিয়েছে।

আগামী বছরের মধ্যেই এই মানববিহীন ডুবোযান (ইউইউভি) বা ড্রোনপ্রযুক্তি প্রস্তুত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের মোট ব্যয় কত, তা জানানো হয়নি। তবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি জানিয়েছেন, তাঁর দেশ এতে ১৫ কোটি পাউন্ড (২০ কোটি ১০ লাখ ডলার) দেবে।

সিঙ্গাপুরে আয়োজিত এক নিরাপত্তা সম্মেলনে তিন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা এ ঘোষণা দেন। মূলত অকাস প্রকল্পের কাজের ধীরগতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পরই এমন ঘোষণা এল।

কাজের ধীরগতির সমালোচনা মেনে নেন জন হিলি। তিনি বলেন, ‘অকাস চুক্তিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুধু কথাই বলেছি। কাজের কাজ খুব কমই হয়েছে।’ তবে তিন দেশের বর্তমান সরকারের অধীন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে বলেও জানান তিনি।

২০২১ সালে এই অকাস প্রতিরক্ষাচুক্তি সই হয়। এর অধীন পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি এবং নিজেদের সামরিক দক্ষতা বিনিময়ের ঘোষণা দেয় এই তিন দেশ।

ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-উপস্থিতি মোকাবিলার একটি উপায় হিসেবেই এই চুক্তিকে দেখেন অনেকে। এ ছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরের মতো বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলোয় উত্তেজনা বাড়ানোর পেছনেও চীনের ভূমিকা রয়েছে। বেইজিংয়ের সেই তৎপরতা ঠেকাতেও এই জোট কাজ করছে।

অকাস চুক্তির ‘পিলার টু’ বা দ্বিতীয় ধাপের প্রথম প্রধান প্রকল্প হলো এই ডুবোড্রোন প্রযুক্তি। চুক্তির এই ধাপের অধীন মিত্রদেশগুলো নিজেদের ‘উন্নত সক্ষমতা’ বাড়াতে একসঙ্গে কাজ করে। এর মধ্যে দূরপাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, ডুবো রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কাজ করার বিষয়ও রয়েছে।

এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এই ডুবোড্রোনগুলোর জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি করবে নতুন এ প্রকল্প। এসব ড্রোন সমুদ্রের তলদেশের অবকাঠামো রক্ষা করতে পারবে। পাশাপাশি এগুলো হামলা চালানো, নজরদারি করা, তথ্য সংগ্রহ ও রসদ সরবরাহের কাজও করবে। জন হিলি আরও জানান, এই ড্রোনগুলোর জন্য বিশেষ সেন্সর ও অস্ত্রব্যবস্থাও তৈরি করা হবে। এর ফলে জোটের বাহিনীগুলো খুব দ্রুতই উন্নত যুদ্ধপ্রযুক্তি পেয়ে যাবে।

সমুদ্রের তলদেশের কেব্‌ল ও পাইপলাইনের ওপর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনেকটাই নির্ভর করে। এগুলো যেকোনো হুমকির মুখে পড়লে তা মোকাবিলা করতেও সাহায্য করবে নতুন এই ড্রোন। হিলি আরও বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ প্রশান্ত মহাসাগর, আটলান্টিক ও সুমেরু অঞ্চলে তাদের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াবে।

মাসখানেক আগেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ তুলেছিলেন জন হিলি। যুক্তরাজ্যের উত্তরের জলসীমায় কেব্‌ল ও পাইপলাইনে রাশিয়া গোপন অভিযান চালাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর এ অভিযোগের পরই নতুন ড্রোনের ঘোষণাটি এল। তবে মস্কো যুক্তরাজ্যের এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

গত ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্য ও নরওয়ে একটি চুক্তি সই করে। সমুদ্রের তলদেশের কেব্‌ল রক্ষা করতে উত্তর আটলান্টিকে রুশ সাবমেরিন খোঁজার জন্যই ওই চুক্তি করেছিল তারা।

যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে প্রায় ৬০টি কেব্‌ল যুক্ত রয়েছে। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের মতে, মস্কোর কারণে এসব কেব্‌ল ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাজ্যের জলসীমায় রুশ জাহাজের আনাগোনা ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

অন্যদিকে তাইওয়ান ও সুইডেনের জলসীমায় সমুদ্রের তলদেশের কেব্‌লের ক্ষতির পেছনে চীনের জাহাজ দায়ী বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

বাল্টিক সাগরেও বেশ কয়েকবার কেব্‌ল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এই ডুবোড্রোন প্রকল্প রাশিয়া ও চীনের সমুদ্রতলের কার্যক্রম মোকাবিলার জন্য নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে গত শনিবার বিবিসির পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়। তবে তিন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা এর কোনো উত্তর দেননি।

অকাস প্রকল্পের কাজের গতি খুব ধীর কি না, এমন প্রশ্নেরও জবাব এড়িয়ে যান তাঁরা। প্রতিরক্ষাচুক্তির ‘পিলার ওয়ান’-এর আওতায় যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি করার কথা। পরে সেগুলো নিজ নিজ দেশের নৌবাহিনী ব্যবহার করবে।

বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার জন্য এ চুক্তি একটি বড় সুযোগ। এর মাধ্যমে দেশটির সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই বাড়বে।

যুক্তরাজ্যের পর অস্ট্রেলিয়াই হবে ওয়াশিংটনের পারমাণবিক সাবমেরিন প্রযুক্তি পাওয়া দ্বিতীয় দেশ। যুক্তরাজ্য কয়েক দশক আগেই এই প্রযুক্তি পেতে শুরু করেছিল।

তবে অস্ট্রেলিয়ার এই বৃহত্তম প্রতিরক্ষা প্রকল্প নিয়ে খোদ দেশটিতেই প্রশ্ন উঠছে। অস্ট্রেলিয়ার পুরোনো সাবমেরিনগুলোর মেয়াদ ফুরিয়ে যাচ্ছে। এগুলো বদলানোর জন্য সময়মতো নতুন সাবমেরিন পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। আদৌ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।

অকাস সাবমেরিনগুলো তৈরি হতে ২০৪০–এর দশক পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। এর আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো পর্যায়ক্রমে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাবে। এরপর ২০৩০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পুরোনো পারমাণবিক সাবমেরিন কিনবে অস্ট্রেলিয়া।

সিঙ্গাপুরে শাংরি-লা ডায়ালগ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কয়েক দিন আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস এই সমালোচনার জবাব দেন। তিনি বলেন, অকাস সাবমেরিন প্রকল্প নিয়ে তাঁদের সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ, তাঁদের হাতে কোনো ‘প্ল্যান বি’ বা বিকল্প পরিকল্পনা নেই।

শনিবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো পর্যায়ক্রমে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা ‘এখনো ঠিক পথেই আছে’। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ বছরের শেষের দিকেই মার্কিন নৌবাহিনীর প্রথম দলের সেখানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

মার্লেস বলেন, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার এইচএমএএস স্টার্লিং নৌঘাঁটি ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ ওই সাবমেরিন বাহিনী রাখার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। এ ছাড়া অকাসের সাবমেরিনগুলো নির্মাণের জন্য দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় একটি ইয়ার্ড তৈরির কাজও ‘দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে’।