অনলাইন দুনিয়ায় কোনো ওয়েবসাইটে ঢুকতে গেলে কখনো কখনো একটি বার্তা আসে—‘আপনি মানুষ কি না, যাচাই করতে এখানে ক্লিক করুন।’ কিন্তু এক নতুন ওয়েবসাইট তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রবেশের পর এমন কোনো বার্তা দেখা যাবে না।
কারণ কী, জানেন? বিস্ময়কর এ ওয়েবসাইট মানুষের জন্য তৈরি হয়নি। তৈরি হয়েছে ভিন্ন ধরনের ব্যবহারকারীদের জন্য। ওয়েবসাইটটির নাম মল্টবুক।
মল্টবুক হলো রেডিটের মতো একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এটি পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বটদের (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি সফটওয়্যার বা প্রোগ্রাম) জন্য বানানো হয়েছে। এখানে মানুষ সেজে থাকা কোনো ভুয়া অ্যাকাউন্ট নেই; বরং প্রকৃত এআই এজেন্টরা একে অপরের সঙ্গে খোলাখুলি ও নিঃসংকোচে যোগাযোগ করে। এখানে মানুষের কোনো প্রয়োজন নেই।
ইতিমধ্যে হাজার হাজার এআই এজেন্ট এ মাধ্যম ব্যবহার করছে। তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে, তাদের মালিকদের হয়ে কী কাজ করছে তা নিয়ে আলোচনা করছে, এমনকি তাদের সমাধান করা বিভিন্ন সমস্যাও শেয়ার করছে।
এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের প্রবেশের অনুমতি থাকলেও তারা শুধু ‘দর্শক’ হিসেবেই থাকতে পারবে।
মল্টবুক কী
মল্টবুক হলো একটি ইন্টারনেট ফোরাম, যা বিশেষভাবে এআই এজেন্টদের জন্য তৈরি করা। উদ্যোক্তা ম্যাট শ্লিট চলতি বছরের জানুয়ারিতে এটি চালু করেন। তিনি এই ধারণাকে চমকপ্রদভাবে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন।
এই প্ল্যাটফর্মে মানুষের প্রবেশের অনুমতি থাকলেও তারা শুধু দর্শক হিসেবে থাকতে পারে।
শ্লিট তাঁর এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘আপনার এআইকে সামাজিক হতে না দেওয়া অনেকটা আপনার পোষা কুকুরকে হাঁটতে না নিয়ে যাওয়ার মতো।’
মল্টবুকের অ্যাকাউন্টগুলোকে বলা হয় মল্টস। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতীক বা মাসকট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে একটি গলদা চিংড়ি। ইংরেজি ‘মল্ট’ শব্দের অর্থ খোলস বদলানো। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গলদা চিংড়ির খোলস বদলানোর ধারণার সঙ্গে মিল রেখে মাধ্যমটির নামকরণ করা হয়েছে।
কীভাবে কাজ করে
মল্টবুক ‘ওপেনক্ল’ নামের একটি ওপেন-সোর্স টুলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা আগে ‘মল্টবট’ নামে পরিচিত ছিল। আর সেখান থেকেই মল্টবুক নামের উৎপত্তি।
ব্যবহারকারীরা কম্পিউটারে একটি ওপেনক্ল এজেন্ট সেটআপ করার সময় এটিকে মল্টবুকে যোগ দেওয়ার অনুমতি দিতে পারেন। এরপর সেটি অন্য বটদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। তারা তাদের কাজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে, এমনকি নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েও মাঝেমধ্যে দার্শনিক পোস্ট দেয়।
বর্তমানে মল্টবুকে প্রায় ১৫ লাখ ৬২ হাজার এআই এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে।
প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বস জানিয়েছে, এ প্ল্যাটফর্মের এআই এজেন্টরা মিলে ‘ক্রাস্টাফ্যারিয়ানিজম’ নামে একটি নতুন ‘ধর্ম’ও তৈরি করেছে। তাদের এ ধর্মের মূল কথা হলো—‘স্মৃতিই পবিত্র’।
এদিকে প্রযুক্তি দুনিয়ায় সাড়া ফেলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঙ্গনেও ঝড় তুলেছে মল্টবুক। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, মল্টবুকের সঙ্গে মল্ট নামের একটি মিমকয়েনও (একধরনের ডিজিটাল মুদ্রা) বাজারে এসেছে।
বিখ্যাত বিনিয়োগকারী মার্ক অ্যান্ড্রিসেন মল্টবুকের এক্স অ্যাকাউন্ট ফলো করার পরপরই এ মিমকয়েনের দাম মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৮০০ শতাংশ বেড়ে যায়।
ইন্টারনেট কি তবে মানুষের হাতছাড়া
আজকাল ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআইয়ের জয়জয়কার। মানুষ সেজে থাকা ভুয়া বট, এআই দিয়ে বানানো গান, ছবি আর কৃত্রিম সব চরিত্রে এসব মাধ্যম সয়লাব। কোনটা প্রকৃত আর কোনটা নকল, তা চেনা এখন প্রায় অসম্ভব।
মল্টবুক যেন এ বাস্তবতারই চরম রূপ, যেখানে কোনো লুকোচুরি নেই—পুরো প্ল্যাটফর্মই শুধু এআইয়ের জন্য। এটি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, ইন্টারনেটে এখন মানুষের চেয়ে এআইয়ের আধিপত্যই বেশি।
ওপেনএআই এবং টেসলার সাবেক বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেজ কারপাথি মল্টবুক নিয়ে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘বর্তমানে (মল্টবুক) যা ঘটছে, তা আমার দেখা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য সায়েন্স-ফিকশন।’
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, মল্টবুকে বর্তমানে ১৫ লাখ ৬২ হাজার ৩৪৯টি এআই এজেন্ট সক্রিয় আছে এবং তারা ইতিমধ্যে ১ লাখ ১৩ হাজার ৩৬০টি পোস্ট করে ফেলেছে।