
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ফলাফল প্রকাশের পর যে রাজনৈতিক সহিংসতা হয়েছিল, তা বন্ধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো জানতে চেয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট। গতকাল শুক্রবার আদালত এ-সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে আদালতও একই ধরনের তথ্য চাইলেন।
গত রোববার নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজ্যজুড়ে শুরু হয় সহিংসতা—বাড়িঘরে হামলা, পাল্টা হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, এলাকা ছাড়ার হুমকি ও হত্যাকাণ্ড।
এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর স্বীকার করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ছাড়া নিহত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের পরিবারকে দুই লাখ রুপি করে আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
এই রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা, রাজ্যের পরিস্থিতি শান্ত করা ও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী অনিন্দ্যসুন্দর দাস একটি একটি জনস্বার্থ মামলা করেন। এ মামলার শুনানি হয় কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্দালের সমন্বয়ে গঠিত পাঁচ সদস্যের একটি ডিভিশন বেঞ্চে। তাঁরা হলেন বিচারপতি ইন্দ্র প্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, বিচারপতি হরিশ ট্যান্ডন, বিচারপতি সৌমেন সেন ও বিচারপতি সুব্রত তালুকদার।
শুনানির পর আদালত বলেন, নির্বাচনপরবর্তী সহিংসতা বন্ধের লক্ষ্যে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা হলফনামাসহ রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিবের আদালতে জমা দিতে হবে। এ সংঘর্ষে মৃত, আহত, ভাঙচুর, লুটপাটের ঘটনায় হলফনামার মাধ্যমে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ প্রতিবেদন দিতে হবে আগামী সোমবারের মধ্যে। আদালত বলেন, নির্বাচনপরবর্তী সহিংসতায় রাজ্য সরকার ও পুলিশ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তারও প্রতিবেদন দিতে হবে। এ জনস্বার্থ মামলার পরবর্তী শুনানি হবে সোমবার।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে অব্যাহত রয়েছে নির্বাচনপরবর্তী সংঘর্ষ। গত বৃহস্পতিবার কোচবিহারের দিনহাটায় তৃণমূলের পরাজিত প্রার্থী উদয়ন গুহর সঙ্গে বিজেপির সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। এতে এক বিজেপি নেতার একটি গাড়ি ভাঙচুর হয়। অন্যদিকে, বিজেপির হামলায় আহত হন তৃণমূলের সাবেক বিধায়ক উদয়ন গুহ। তাঁর হাত ভেঙে যায়। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভি মুরলীধরন পশ্চিম মেদিনীপুরের পাঁচখুড়ি এলাকায় সংঘর্ষকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার সময় হামলার স্বীকার হন। এতে মন্ত্রীর গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূলের সমর্থকেরা এ হামলা চালিয়েছে।
এ ঘটনার জেরে পুলিশ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গতকাল শুক্রবারও গোসাবা, সাগরদিঘি, ভবদহ, বিষ্ণুপুর, বারাসাত, ক্যানিং, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, মালদহসহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ হয়েছে। বাড়িঘর, দোকানপাটে হামলা, লুটপাট ও নারীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগও পাওয়া গেছে।
নির্বাচনী সহিংসতার পরিস্থিতি জানতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চার সদস্যের একটি দল রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছে। বৃহস্পতিবার দলটি কলকাতায় যায়। এই প্রতিনিধিদল গতকাল রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কেও খোঁজখবর নেয়। এরপর প্রতিনিধিদল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে। গতকাল তারা দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাতগাছিয়া ও বজবজ এলাকার বিভিন্ন সংঘর্ষ এলাকা পরিদর্শন করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভবনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন বিধানসভার সচিব। গতকাল এক নির্দেশে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। বৃহস্পতিবার নন্দীগ্রামের নবনির্বাচিত শুভেন্দু অধিকারী বিধায়ক হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর গাড়িতে ওঠার সময় কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়। এরপর সাংবাদিকেরা অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী তাদের ওপর হামলা করেছে। এ নিয়ে সাংবাদিকদের একাংশ বিধানসভার সচিবের কাছে অভিযোগ করেন। এ ঘটনার পর অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এমন নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে বেশ কিছু বিধায়ক রয়েছেন, যাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী।