বাঙালিরা কেমন আছেন আসামে?

উত্তর-পূর্ব ভারতে উৎসবের মেজাজে চলছে লোকসভার ভোট। ছবি: প্রথম আলো
উত্তর-পূর্ব ভারতে উৎসবের মেজাজে চলছে লোকসভার ভোট। ছবি: প্রথম আলো

বাঙালি চিকিৎসক কীর্তি দে (৭৬)। গত ৪৬ বছরে অন্তত ৫ হাজার শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছে তাঁর কল্যাণে। তিনসুকিয়ার প্রথম বেসরকারি নার্সিং হোমও তাঁর। ‘বঙাল খেদা’ আন্দোলনের সময় তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে ছুরির আঘাত। সেই সময়ে তিনি ও তাঁর দুই সহকর্মীদের নিয়ে খিলঞ্জিয়ারা (ভূমিপুত্র) বলতেন, ‘পটল-কীর্তি-হীরালাল, বঙালির তিন দালাল।’ জঙ্গি সংগঠন উলফা তাঁকে বহুবার নানাভাবে হয়রানিও করেছে।

আসামের দীর্ঘদিনের এই বাসিন্দার কাছে প্রশ্ন ছিল, ‘কেমন আছেন?’ আগের ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘এখন সবকিছুই গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। তাঁরাও (অসমিয়ারা) বুঝেছেন। এখন কোনো অসমিয়া বাড়িতে অনুষ্ঠান হলেও আগে আমাকেই ডাকা হয়। এমনকি উলফার আলোচনাপন্থীদের অনুষ্ঠানের মঞ্চেও ডাকা হয় আমাকে।’

নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের সহসভাপতি কীর্তি দে। তাঁর জন্ম নোয়াখালীতে। কীর্তি নিজেই সম্প্রীতির জীবন্ত প্রতীক। তাঁর স্ত্রী খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী, বাংলাদেশের ময়মনসিংহের বাসিন্দা ছিলেন একসময়। কীর্তির এক ছেলের বউ অসমিয়া, আরেকজনের স্ত্রী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত সবাই। কীর্তি বলেন, ‘বাঙালিরা যেমন থাকার, তেমনই আছেন।’ এর বেশি ব্যাখ্যা দিতে নারাজ তিনি। তাঁর কথাতেই ধরা পড়ে, নিজভূমে পরবাসের মতো অবস্থায় রয়েছেন বাঙালিরা।

বাঙালিরা কেমন আছেন আসামে? ভোটের মৌসুমে প্রশ্নটা শুনে শুধু কীর্তি নন, আশাবুল রহমান, সুপ্রিয় দে বা তানিমা খাতুনরাও বলছেন, ভালো আছি। ভালো আছেন মারোয়ারিরাও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ডুমডুমার রাজস্থান সুইটসের মালিক বললেন, ‘সমস্যা তো কিছু নেই। ভালোই আছি।’ কিন্তু ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় স্পষ্ট—ভালো নয়, ভয়ে আছেন তাঁরা।

বংশপরম্পরায় আসামে বাস করেও সেখানকার বাঙালিদের নতুন করে দিতে হচ্ছে নাগরিকত্বের প্রমাণ। ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও রাজ্যের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারের নামের পাশে বসানো হয়েছে ‘ডি’। ডি মানে ডাউটফুল, সন্দেহজনক। অর্থাৎ তাঁরা ‘বিদেশি’। আসামে বিদেশি অর্থ অবশ্য ‘বাংলাদেশি’। নামের পাশে ডি বসলেই ভোটাধিকার নেই। আর ‘ডি’-এর সংখ্যা বেশি বাঙালিদের নামের পাশেই। এনআরসি ছুটও বাঙালিরাই বেশি।

ক্যাব (নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল), এনআরসি (নাগরিকপঞ্জি) আর ডি (ডাউটফুল ভোটার)—এই তিনের জাঁতাকলের মধ্যেই বৃহস্পতিবার আসামে ভোট শুরু হয়ে গেছে। একসময় আসামে কংগ্রেসের মূল অস্ত্র ছিল—‘আলি, কুলি ও বঙালি।’ ‘আলি’ মানে আসামের ভোট রাজনীতিতে ‘বাংলাদেশি মুসলিম’। কুলি হলেন চা–বাগানের শ্রমিকেরা। আর বাঙালি বলতে বোঝানো হতো শুধুই হিন্দু বাংলাভাষীদের। ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘুদের এই কংগ্রেসি ভোট ব্যাংকে গেরুয়া শিবিরের থাবা স্পষ্ট। ভোটেও তাঁর প্রভাব যে পড়ছে, সেটা মেনে নিচ্ছেন কংগ্রেস নেতারাও।

চা–বাগানের পাশাপাশি হিন্দু বাঙালি মহলও বিজেপির বড় ভরসা। বিভাজনের রাজনীতিতে কংগ্রেসের ভরসা এখনো মুসলিম ভোট। তবে অনেকেই মনে করছেন এনআরসি ও ক্যাব বিতর্ক এবার সব হিসাবেই গোলমাল ঘটাতে পারে। সেই গোলমাল আদৌ ভোটের ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তাই এখন দেখার।

প্রথম পর্যায়ের ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে আজ বৃহস্পতিবার থেকে। এদিন ভোটারদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ। কলিয়াবোরের কংগ্রেস প্রার্থী গৌরব গগৈয়ের দাবি, তিনি জিতছেনই। তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বিজেপির জোট শরিক অসম গণ পরিষদের প্রার্থী মণিমাধব মহন্তের পাল্টা দাবি, তিনিই জিতছেন। মহন্ত বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উন্নয়ন দেখেই মানুষ বিজেপিকে ভোট দিচ্ছেন।’ তবে কংগ্রেস এদিন ভোটে ব্যাপক গোলমালের অভিযোগ তুলেছে। বিজেপি অবশ্য সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে।