
খনিজ সম্পদ ও বিরল খনিজের সরবরাহ নিশ্চিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি কাঠামোগত সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস এ তথ্য জানিয়েছে। এই চুক্তির আওতায় খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
নয়াদিল্লিতে গতকাল মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যে এই চুক্তি চূড়ান্ত হয়। রুবিও বর্তমানে চার দিনের ভারত সফরে রয়েছেন।
নিরাপত্তা জোট ‘কোয়াড’-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনের আগে রুবিও কয়েক দিন ভারতে অবস্থান করেন। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত এই জোটের সদস্য। মঙ্গলবার কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও খনিজ সম্পদ নিয়ে আলাদা একটি কাঠামোর ঘোষণা দিয়েছে ভারত।
ঘোষিত এই কাঠামো এবং ভারতের খনিজ মজুত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো।
অত্যাবশ্যকীয় খনিজ কী এবং এর গুরুত্ব কেন?
ব্যাটারি, ঘড়ি, সেমিকন্ডাক্টর ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে এসব খনিজ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এসব উপাদান তাদের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। তবে এসব খনিজের সরবরাহব্যবস্থা সহজেই ব্যাহত হতে পারে।
নিকেল, কোবাল্ট, লিথিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম ও জিংক—এ জাতীয় খনিজের মধ্যে অন্যতম। অন্তত ১২টি খনিজের জন্য যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া আরও ২৯টি খনিজের চাহিদার অন্তত অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্র বিদেশ থেকে মেটায়।
অত্যাবশ্যকীয় খনিজের মধ্যে ১৭টি বিরল খনিজ রয়েছে। এর মধ্যে পর্যায় সারণির ১৫টি ল্যান্থানাইডসহ স্ক্যান্ডিয়াম ও ইট্রিয়াম অন্তর্ভুক্ত। এসব উপাদানের ১২টির মজুত চীনে রয়েছে। এসব বিরল খনিজের বিশেষ চৌম্বকীয় গুণ রয়েছে। স্থায়ী চুম্বক তৈরিতে এগুলো অপরিহার্য।
এই চুম্বক শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদক, ইলেকট্রনিকস এবং বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির হার্ডওয়্যারের মূল যন্ত্রাংশ তৈরিতেও এসব বিরল খনিজ ব্যবহৃত হয়।
বিরল খনিজ প্রক্রিয়াকরণের খরচ অনেক বেশি। এসব খনিজ উত্তোলনে প্রচুর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এতে বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি হয়।
বর্তমানে বিশ্বের বিরল খনিজ সরবরাহের সিংহভাগই চীনের নিয়ন্ত্রণে। বিশ্বের ৬০ শতাংশ বিরল খনিজ চীনেই রয়েছে। আর বিশ্বজুড়ে এসব খনিজ প্রক্রিয়াকরণের ৯০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে দেশটি।
এসব খনিজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ চীনের ওপর নির্ভরশীল। ওয়াশিংটন বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই নির্ভরতা কমাতে চাইছে। তাই তারা আমদানির উৎস বৃদ্ধি করতে সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে।
ভারতের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ওডিশা, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুতে ‘রেয়ার আর্থ করিডোর’ বা বিরল খনিজ অঞ্চল তৈরির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ১ এপ্রিল থেকে এই অর্থবছর শুরু হয়েছে। এসব এলাকা হবে বিরল খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্র।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অত্যাবশ্যকীয় খনিজ কাঠামো চুক্তি কী
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এই কাঠামোগত চুক্তির লক্ষ্য হলো খনিজ সম্পদ খাতে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এর আওতায় খনিজ উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং এ–সংক্রান্ত বিনিয়োগ জোরদার করা হবে।
ভারতের এক বিবৃতিতে গত ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত একটি খনিজ সম্মেলনের কথা বলা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সেই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। একই মাসে ভারত সেমিকন্ডাক্টর ও এআই সরবরাহব্যবস্থা–সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামের একটি উদ্যোগে যোগ দেয়।
মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, মঙ্গলবার একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়েছে। দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এই কাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা রক্ষা করতে কাজ করবে। বাজারে চাপ সৃষ্টি বা একক দেশের একচেটিয়া আধিপত্য কমানোই এর মূল লক্ষ্য।’
তবে বিবৃতিতে চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্ত বা এই সহযোগিতা কীভাবে কার্যকর হবে, তা বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ভারতের কাছে কোন কোন বিরল খনিজ রয়েছে
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ভারত সরকার ৩০টি খনিজকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে চিহ্নিত করে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিমনি, বেরিলিয়াম, বিসমাথ, কোবাল্ট, তামা, গ্যালিয়াম, জার্মেনিয়াম, গ্রাফাইট, হাফনিয়াম, ইন্ডিয়াম, লিথিয়াম, মলিবডেনাম, নাইওবিয়াম, নিকেল, প্লাটিনাম গ্রুপ এলিমেন্ট, ফসফরাস, পটাশ, বিরল খনিজ, রেনিয়াম, সিলিকন, স্ট্রনশিয়াম, ট্যানটালাম, টেলুরিয়াম, টিন, টাইটানিয়াম, টাংস্টেন, ভ্যানাডিয়াম, জিরকোনিয়াম, সেলেনিয়াম ও ক্যাডমিয়াম।
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কাছে ১ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টন মোনাজাইট রয়েছে। এটি বিরল খনিজের অন্যতম প্রাকৃতিক উৎস। ভারত সরকারের হিসাবে, এই মোনাজাইটে বিরল খনিজ অক্সাইডের (আরইও) পরিমাণ ৭২ লাখ ৩০ হাজার টন। বিপরীতে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, চীনের কাছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টন আরইও মজুত আছে। এটি বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় অর্ধেক।
মার্কিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রশাসন (আইটিএ) এ বছর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ভারত বর্তমানে মাত্র চারটি অত্যাবশ্যকীয় খনিজ উৎপাদন করে। এগুলো হলো তামা, গ্রাফাইট, ফসফরাস ও টাইটানিয়াম। আইটিএর মতে, খনিজ অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির অভাবে ভারত পিছিয়ে আছে।
ভারতের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ওডিশা, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুতে ‘রেয়ার আর্থ করিডোর’ তৈরির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ১ এপ্রিল এই অর্থবছর শুরু হয়েছে। এসব এলাকা হবে বিরল খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্র। এখানে গবেষণার পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইন ও অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত উচ্চমানের স্থায়ী চুম্বক তৈরি করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রশাসনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত বর্তমানে মাত্র চারটি অত্যাবশ্যকীয় খনিজ উৎপাদন করে। এগুলো হলো তামা, গ্রাফাইট, ফসফরাস ও টাইটানিয়াম। আইটিএর মতে, খনিজ অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির অভাবে ভারত এ খাতে পিছিয়ে আছে।
কোয়াড বিরল খনিজ উদ্যোগ কী
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বহুপক্ষীয় নথি প্রকাশ করেছে। সেখানে কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে খনিজ সরবরাহের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিভিন্ন দিক বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
নথিতে বলা হয়েছে, কোয়াডভুক্ত দেশের সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলো এই উদ্যোগে ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। ঋণ, গ্যারান্টি, ভর্তুকি এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে এই তহবিল সংগ্রহ করা হবে। খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্পে এই অর্থ খরচ করা হবে। মূলত নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা কমানোই এর মূল লক্ষ্য।
কোয়াড দেশগুলো খনিজ উত্তোলনের অনুমতি ও লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কারিগরি তথ্য বিনিময়েও একমত হয়েছে।
সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে তারা খনিজ সম্পদ পুনরুৎপাদন ও পুনরুদ্ধারেও কাজ করবে। কোয়াডভুক্ত দেশ এবং সমমনা দেশগুলোর মধ্যে খনিজ পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র আর কোন দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে
গত ডিসেম্বরে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের রিকো ডিকে খনিজ উত্তোলনে ১২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে আয়োজিত খনিজ সম্পদবিষয়ক এক বৈঠকে ১১টি দেশের সঙ্গে কাঠামো চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশগুলো হচ্ছে আর্জেন্টিনা, কুক আইল্যান্ডস, ইকুয়েডর, গিনি, মরক্কো, প্যারাগুয়ে, পেরু, ফিলিপাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য ও উজবেকিস্তান।
এ ছাড়া গত এপ্রিলে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ফালাবোরওয়া রেয়ার আর্থ প্রজেক্ট’-এ ৫ কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।