অমৃতসরে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মান। ২৮ জুন, ২০২৬
অমৃতসরে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মান। ২৮ জুন, ২০২৬

পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর তিরে বিদ্ধ জ্ঞানেশ কুমারের ভাই

দিল্লি বিমানবন্দরে তাঁকে তিন ঘণ্টা আটকে রাখার নেপথ্য কারণ জানিয়ে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মান ভোটের আগে রাজনীতিতে অন্য মাত্রা জুড়লেন। গতকাল শুক্রবার রাজ্য বিধানসভায় তিনি জানালেন, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে ফেরার সময় দিল্লি বিমানবন্দরে তাঁকে অহেতুক আটকে রাখা হয়। জিনিসপত্র তল্লাশি করা হয় এবং ৫০ হাজার রুপি জরিমানার চালান কাটা হয়। এ কাজের নেপথ্যে ছিলেন যিনি, তিনি এ দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভাই মণীশ কুমার।

মানের অভিযোগ, এটাই বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার কায়দা। মণীশ কুমারের পরিচয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উনি ইন্ডিয়ান রেভিনিউ সার্ভিসের (আইআরএস) কর্মকর্তা, দিল্লি শুল্ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত।’

পাঞ্জাবের ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) ও সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্ম নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে এক প্রস্তাব শুক্রবার পাঞ্জাব বিধানসভায় গৃহীত হয়। এ নিয়ে আলোচনার সময় অনেক সদস্য সিইসির পদত্যাগ দাবি করেন। প্রস্তাব পাস হওয়ার সময় কংগ্রেস, শিরোমনি অকালি দল ও বিজেপি সদস্যরা সভায় উপস্থিত ছিলেন না।

পাঞ্জাবের শাসন ক্ষমতায় রয়েছে আম আদমি পার্টি (আপ)। সেই দলেরই মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মান। বিজেপি ওই রাজ্যে বিরোধী পক্ষ। রাজনৈতিক দিক থেকে কংগ্রেসও আপের প্রতিপক্ষ। এসআইআর নিয়ে এবং অন্যান্য নানা কারণে পাঞ্জাব সরকারের সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক রেষারেষি অব্যাহত আছে।

ওই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সময়ই মুখ্যমন্ত্রী মান দিল্লি বিমানবন্দরে তাঁকে ‘হেনস্তার’ বিষয়টির অবতারণা করে মণীশ কুমারের বিরুদ্ধে এই মারাত্মক অভিযোগ করেন।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘শুল্ক বিভাগের কর্মীরা বারবার বলতে থাকেন, আমার জিনিসপত্র তল্লাশি করা হবে। তল্লাশি শেষে কিছুই না পাওয়ায় তাঁরা আমাকে যেতে দেন। যখন বেরোচ্ছি, তখনই সেই কর্মকর্তারা আবার এসে বলেন, ওপর মহল থেকে তাঁদের ওপর খুব চাপ রয়েছে। একটা চালান কাটতেই হবে। তারপর তাঁরা ৫০ হাজার রুপি জরিমানা ধার্য করেন।’

এ সময়েই বিজেপির উদ্দেশে মান বলেন, ‘এভাবেই ওরা প্রতিশোধ নেয়। দিল্লি এয়ারপোর্টের শুল্ক কর্মকর্তা কে? তাঁর নাম মণীশ কুমার। তিনি এ দেশের সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের ভাই।’

এ অভিযোগের কথা জানাজানি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিজেপি তীব্র প্রতিবাদ জানায়। দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক অনিল সারিন বলেন, ‘এসব কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দায়ভার এড়াতে পারেন না। মুখ্যমন্ত্রীর বরং জানানো উচিত কী কারণে শুল্ক বিভাগ তাঁকে ৫০ হাজার রুপি জরিমানা করেছে। জরিমানার সেই কাগজ প্রকাশ্যে আনলেই বোঝা যাবে। সাহস থাকলে মুখ্যমন্ত্রী তা করুন।’

সারিন বলেন, ‘প্রটোকল অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রীরা অবশ্যই কিছু সুবিধা পান। কিছু ছাড় পেয়ে থাকেন, যেমন তাঁদের দেহ তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। জিনিসপত্রও তল্লাশি করা হয় না। কিন্তু তাই বলে মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গীরা সেই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন। তাঁদের মালপত্রও তল্লাশি এড়াতে পারে না।’

পাঞ্জাবের শাসন ক্ষমতায় রয়েছে আম আদমি পার্টি (আপ)। সেই দলেরই মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মান। বিজেপি ওই রাজ্যে বিরোধী পক্ষ। রাজনৈতিক দিক থেকে কংগ্রেসও আপের প্রতিপক্ষ। এসআইআর নিয়ে এবং অন্যান্য নানা কারণে পাঞ্জাব সরকারের সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক রেষারেষি অব্যাহত আছে।

ভারতের মুখ্যমন্ত্রীদের বিদেশ সফরের আগে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে অনুমতি নিতে হয়। বিদেশ সফরের চরিত্রসহ নানা বিষয় বিবেচনা করে কেন্দ্র ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ ইস্যু করে। মুখ্যমন্ত্রী মানকে এর আগে একাধিকবার বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এবারও ফ্রান্সে যাওয়ার অনুমতি মানকে দিতে কেন্দ্র অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। হাইকোর্টের নির্দেশেই তিনি ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর প্যারিস যান ‘এসআইএএল প্যারিস ২০২৬’ আন্তর্জাতিক খাদ্যমেলায় যোগ দিতে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী গুরপ্রীত কৌরও ছিলেন।

দিল্লির শুল্ক কর্মকর্তা মণীশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সময় মুখ্যমন্ত্রী মান বলেন, পাকিস্তানের পাঞ্জাবি কবি বাবা বসির হুসেন নাজমি তাঁকে লাহোরে বিশ্ব পাঞ্জাবি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। নভেম্বর মাসের ২৭ তারিখ সেই সম্মেলন হবে। মান বলেন, ‘কিন্তু আমি তাঁকে বলেছি, আমাকে যাঁরা ফ্রান্স যেতে অনুমতি দেন না, তাঁরা কীভাবে পাকিস্তান যেতে দেবেন? অথচ এ দেশ থেকে বহু পাঞ্জাবি কবি ও লেখক পাকিস্তান যাবেন। তাঁদের আশা, সরকার সেই অনুমতি তাঁদের দেবে। দুই দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি যে এক।’

মান এ কথাও বলেন, তিনি চান, কারতারপুর করিডর খুললে বিধানসভার সরকার ও বিরোধী পক্ষের সব সদস্য কারতারপুর সাহেব যান। শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেব তাঁর জীবনের শেষ ১৮ বছর কারতারপুরে কাটিয়েছেন। সেখানেই তিনি দেহ রাখেন। তাঁর স্মৃতিতে তৈরি হয় দরবার সাহেব গুরুদ্বার। দেশভাগের পর কারতারপুর পাকিস্তানের পাঞ্জাবে পড়ে। ভারতীয় পাঞ্জাবের গুরদাসপুর সীমান্ত থেকে পাকিস্তান পাঞ্জাবের কারতারপুরের দূরত্ব মাত্র ৪ কিলোমিটার। ভিসামুক্ত এ করিডর দিয়ে ভারতীয় পুণ্যার্থীরা কারতারপুর যাওয়া-আসা করে থাকেন।