
রাইহান রাজীব ভদ্রের মা কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র। রাইহানের বয়স ২৬। সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। ছবি তোলা তাঁর প্যাশন। নানা জায়গায় ছবির প্রদর্শনী করেন। গতকাল বুধবার নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া গেটের কাছে বিকানির হাউসে তাঁর তোলা ছবির এক প্রদর্শনী শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে অধিকাংশ ছবি সরিয়ে দিতে বলা হয়। প্রদর্শনীতে মোট ১০৫টি ছবি ছিল। রাইহানকে সরিয়ে দিতে হয়েছে ৭৪টি।
বিপত্তির শেষ ওখানেই হয়নি। কর্তৃপক্ষ রাইহানকে জানায়, ছবি সরিয়ে নেওয়ার ফলে দেয়ালের ফ্রেম ফাঁকা হয়ে গেছে। ওভাবে ফাঁকা ফ্রেম রাখা যাবে না। গণমাধ্যমকে রাইহান জানিয়েছেন, ‘শিল্পকর্মের ওপর কোনো রকম বাধা সৃষ্টি করা আমি অন্যায় মনে করি। যত বিধিনিষেধই সৃষ্টি করা হোক, শিল্প তার পথ ঠিকই খুঁজে নেয়। মানুষের কাছে পৌঁছেও যায়।’ তিনি বলেছেন, এসব ছবি নিয়ে তিনি অন্যত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করবেন।
রাইহানের এই প্রদর্শনীর নাম ‘নো আইডিয়া ইজ ফাইনাল’। অনুমতি দেওয়া সত্ত্বেও একেবারে শেষ মুহূর্তে বিকানির হাউস কর্তৃপক্ষ কেন এই কাজ করল, সে বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, যোগাযোগ করা সত্ত্বেও বিকানির হাউস কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে সাড়া দেয়নি।
মরু রাজ্য রাজস্থানের বিকানিরের মহারাজা গঙ্গা সিং ১৯২৯ সালে দিল্লির ইন্ডিয়া গেটের কাছে ৮ একর জমির ওপর এই প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন। স্বাধীনতার পর রাজস্থান সরকার এই সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে নেয়। বর্তমানে বিজেপিশাসিত রাজস্থান সরকারের রেসিডেন্ট কমিশনার এটির পরিচালক। বিকানির হাউস দিল্লির অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
ছবি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া নিয়ে রাইহানের মা প্রিয়াঙ্কার মতামত জানতে চেয়েছিল সংবাদ সংস্থা পিটিআই। প্রিয়াঙ্কা তাদের বলেন, ‘সিদ্ধান্তটি হাস্যকর। দেশের যুব সম্প্রদায়ের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। আজ রাইহান, কাল অন্য কোনো শিল্পীর কণ্ঠরোধ করা হবে এভাবে।’
কংগ্রেস নেতা কার্তি চিদম্বরম বলেছেন, এটা সেন্সরশিপ। এটা অবিবেচকের মতো আচরণ ও অমার্জনীয় অপরাধ।
রাইহানের এই প্রদর্শনী থেকে সেই সব ছবি সরিয়ে দেওয়া হয়, যা তিনি ছয় মাস ধরে বিভিন্ন আন্দোলনের সময় তুলেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘ক্যামেরার লেন্স দিয়ে আন্দোলনকে যেভাবে দেখেছি, তা অন্যদের দেখাতে চেয়েছি। বাইরে থেকে নয়, আন্দোলনের ভেতরে থেকে তা লেন্সবন্দী করার আকর্ষণই আলাদা। ছবি তখন কবিতা হয়ে ওঠে।’
গতকাল সন্ধ্যায় ছবি সরিয়ে নেওয়ার পর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে রাইহান বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার সময় কর্তৃপক্ষ প্রথম তাদের আপত্তির কথা জানায়। তারা বলেছিল, ‘এ বিষয়ে পরে তাদের সিদ্ধান্ত জানানো হবে। পরের দিন গতকাল বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তারা লিখিতভাবে আপত্তির কথা জানিয়ে দেয়। প্রদর্শনী শুরু হতে তখন আর মাত্র তিন ঘণ্টা বাকি। ওরা আমাকে আধা ঘণ্টার মধ্যে ৭৪টি ছবি সরিয়ে দিতে বলেছে।’
রাইহানকে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, বিষয়বস্তু ও সময়কাল এমন যে, এ সময় ওসব ছবি দেখানো যাবে না। ছবির বিষয়বস্তু খোলামেলাভাবে রাজনৈতিক। গোটা শহর অবরুদ্ধ। এসব ছবি দেখানোর প্রকৃষ্ট সময় এটা নয়।
রাইহান বলেন, ৭৪টি ছবি সরিয়ে নেওয়ার পর তারা বলেছে, এভাবে খালি ফ্রেমও রাখা যাবে না। সেগুলোও সরাতে হবে।
রাইহান আরও বলেন, ১৫ অক্টোবর তিনি এই প্রদর্শনীর ‘লে আউট’ বা নকশা পাঠিয়েছিলেন। আজ তারা জানাচ্ছে, সেটা নাকি পাঠযোগ্য ছিল না। তা ছাড়া এত দিনে তারা একবারও বলেনি, প্রতিটি ছবি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হবে। সব ছবি আগে থেকে দেখানোর নির্দেশও তারা দেয়নি।
যেসব ছবি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে জাতীয় পতাকাও ছিল।
রাইহান বলেন, ‘জাতীয় পতাকা থাকা ছবি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। আমি বলি, নিজের হাতে আমি জাতীয় পতাকা থাকা ছবি নামিয়ে দিতে পারব না। আমি চলে যেতে ওরাই সেসব ছবি সরিয়ে দেয়। ওদের এই সিদ্ধান্ত বিস্ময়কর। সেই অর্থে আমি মনে করি, সব শিল্পকর্মই রাজনৈতিক।’
প্রিয়াঙ্কার ছেলে বলেন, এ ঘটনা জনসাধারণের সাংস্কৃতিক পরিসরগুলোর দায়িত্ব সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও স্পষ্ট করেছে। তাঁর কথায়, ‘এসব আন্দোলন প্রত্যক্ষ করা ছিল এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। আমি মনে করি, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু সেগুলোর মালিক বা পরিচালনাকারীদের প্রতি নয়, বৃহত্তর জনসমাজের প্রতিও রয়েছে। কেউ ক্ষুব্ধ হতে পারে, কেউ বিঘ্নিত বোধ করতেও পারে। কিন্তু কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যদি শিল্পকর্মের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করে, তবে তা অন্যায়।’
রাইহান বলেন, আগে তিনি যেভাবে ভাবতেন, কাজ করতেন, এবার তা থেকে সরে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আগে আমি আখ্যান তৈরি করতাম। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিল্পকর্ম সাজাতাম। এবার আগে শিল্পকর্ম সাজিয়েছি। পরে আখ্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে চেয়েছি। এই শিল্পকর্মগুলোর বিষয়বস্তু বন্য প্রাণী, গণ–আন্দোলন এবং বিমূর্ত চিত্রকল্প।
রাইহানের এই ভাঙা প্রদর্শনী আগামী রোববার পর্যন্ত চলবে।