
আগামী ৬ অক্টোবর ভারতে পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে আসন্ন উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক পারদ এখন চরমে। এদিকে বিরোধী প্রার্থীদের সুকৌশলে ময়দান থেকে সরিয়ে দিয়ে একতরফা জয়ের রাস্তা সুগম করার জোরালো অভিযোগ উঠেছে শাসক দল বিজেপির বিরুদ্ধে। রাজ্যের প্রশাসনিক শক্তি ও পুলিশকে ব্যবহার করে বিরোধী প্রার্থীদের ভয় দেখানো, পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার করা এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করে প্রার্থী পদ প্রত্যাহারে বাধ্য করার যে অভিযোগগুলো সামনে আসছে, তা নিয়ে সরগরম রাজ্য রাজনীতি।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিরোধীরা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছে। সম্প্রতি গঠিত আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবীর অভিযোগ করেছেন, তাঁর দলের কর্মী ও সমর্থকদের ক্রমাগত পুলিশি হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। রেজিনগরে দলের প্রার্থী তথা হুমায়ুন কবীরের ছেলে গোলাম নবী আজাদের হয়ে প্রচার চালাতে গিয়ে কর্মী-সমর্থকেরা গ্রেপ্তারের মুখে পড়েছেন। এমনকি এজেইউপির এক ‘ডামি’ প্রার্থী সাইফুল আলমসহ চারজন সক্রিয় কর্মীকে পুরোনো মামলায় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নিয়েছে যে মাঠের প্রচার বন্ধ করে কেবল সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে এজেইউপি।
একই চিত্র ধরা পড়েছে নন্দীগ্রামেও। সেখানে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ মনোনীত প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে আচমকা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। এর পরপরই তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে ১৯ বছরের পুরোনো একটি মামলায় নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মিলন প্রধানের স্ত্রী অর্পিতা প্রধান সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, এত দিন বাইরে থাকা সত্ত্বেও কেন নির্বাচনের ঠিক মুখে তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হলো। নন্দীগ্রামের এই ঘটনাবলির জেরে রেজিনগরে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করা নিয়ে বিরোধীদের পুরোনো অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। এমনকি রেজিনগরের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ রবিউল আলম চৌধুরীও প্রথমে পুলিশি হেনস্তা এবং কর্মীদের সুরক্ষার অভাবে নাম প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছিলেন, যদিও পরবর্তী সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশ্বাসে তিনি লড়াইয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, গেরুয়া শিবিরের এমন কৌশল নতুন নয়। ইতিপূর্বে গুজরাট, উত্তর প্রদেশ ও অরুণাচল প্রদেশের মতো রাজ্যেও উপনির্বাচনে বিজেপি সুকৌশলে এ ধরনের পথ অবলম্বন করে সুবিধা পেয়েছিল। সেই সব রাজ্যে বিরোধী প্রার্থীদের নানা প্রশাসনিক জটিলতায় ফেলে মনোনয়ন বাতিল করানো, আইনি চাপ সৃষ্টি করে অথবা প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করার মতো ঘটনা সামনে এসেছিল। এর ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোট গ্রহণের আগেই বিজেপি প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল, আবার কোথাও বিরোধীদের কোণঠাসা করে একতরফা জয় নিশ্চিত করা হয়েছিল।
তবে এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছে বিজেপি। কোচবিহারে এক কর্মসূচিতে গিয়ে বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ দাবি করেছেন, উপনির্বাচনে ওই দুই বিধানসভা কেন্দ্রে বিরোধীদের কোনো অস্তিত্ব নেই তো বটেই, এমনকি তাঁদের কাছে কোনো যোগ্য প্রার্থী পর্যন্ত নেই। কেবল পরাজয়ের আশঙ্কায় বিরোধীরা এ ধরনের অমূলক অভিযোগ তুলে রাজনীতি করার চেষ্টা করছেন বলে পাল্টা অভিযোগ করেছেন দিলীপ ঘোষ।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সব আইনি পদক্ষেপ নিয়ম মেনেই নেওয়া হচ্ছে এবং দীর্ঘদিনের পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও যেভাবে নির্বাচনের মুখে বিরোধীদের দমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে, তাতে সাধারণ ভোটারদের মনে উপনির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।