
আদানি গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের শর্তে আদানি ও তাঁর ভাতিজার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রত্যাহার
আদালত অভিযোগ প্রত্যাহার অনুমোদন করলে জরিমানা হিসেবে গৌতম আদানিকে ৬০ লাখ এবং সাগর আদানিকে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হবে।
ইরান নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে জ্বালানি কেনার বিষয়ে ২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানা পরিশোধের শর্তে সমঝোতা।
ভারতের আলোচিত ব্যবসায়ী গৌতম আদানি ও তাঁর ভাতিজা সাগর আদানির বিরুদ্ধে আনা সব ফৌজদারি অভিযোগ স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। প্রসিকিউটররা এসব অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন না, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পর নিউইয়র্কের এই হাই প্রোফাইল সিকিউরিটিজ ও ওয়্যার ফ্রড (প্রতারণা) মামলার পুরোপুরি শেষ হলো।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন গতকাল সোমবার গৌতম আদানির বিরুদ্ধে ফৌজদারি প্রতারণার অভিযোগ খারিজ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর প্রধান প্রতিষ্ঠান আদানি এন্টারপ্রাইজেসের বিরুদ্ধে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগেরও মীমাংসা করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে গত দু-এক দিনে ভারতীয় এই ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ও আইনি সংস্থার একাধিক তদন্তের সব কটিই বন্ধ হয়ে গেল। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস গত সপ্তাহে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, আদানির আইনজীবী রবার্ট জিউফ্রা জুনিয়র (যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও ব্যক্তিগত আইনজীবী) এক উপস্থাপনায় বলেছিলেন, আদানি যুক্তরাষ্ট্রে এক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মামলার কারণে তা করতে পারছিলেন না।
আদানির বিরুদ্ধে অভিযোগ, ভারতের বৃহত্তম সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন পেতে আদানি গ্রুপ সে দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের ২৬ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার ঘুষ দিতে রাজি হয়েছিল। আদানি গ্রুপ শুরু থেকেই কোনো ধরনের অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। আদানি এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান।
এর আগে গতকাল আদানি এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড (এইএল) ইরানের ওপর ‘অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল’–এর (ওএফএসি) আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্পষ্টভাবে লঙ্ঘনের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য দেওয়ানি দায় মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের ওএফএসির সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। এ জন্য তারা ২৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে রাজি হয়েছে।
এক্সচেঞ্জ ফাইলিংয়ে আদানি এন্টারপ্রাইজেস (এইএল) জানিয়েছে, ওএফএসির আনা অভিযোগ স্বীকার না করেই এই সমঝোতা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এটি এ ধরনের দ্বিতীয় চুক্তি।
এইএল জানায়, সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানি ওএফএসিকে ২৭ লাখ ৫০ লাখ ডলার জরিমানা দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা আইনগত সর্বোচ্চ জরিমানা ৩৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে কিছুটা কমানো হয়েছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) গৌতম আদানি ও সাগর আদানির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সম্মতিসূচক রায়ের সিদ্ধান্ত এগিয়ে নেয়। এর আগে তাঁদের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে ‘আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেড’-এর বন্ড ছাড়ার ক্ষেত্রে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বিবৃতি দেওয়ার অভিযোগ এনেছিল এসইসি। আদালত এটি অনুমোদন করলে গৌতম আদানি ও সাগর আদানিকে দেওয়ানি আর্থিক জরিমানা হিসেবে যথাক্রমে ৬০ লাখ ডলার এবং ১ কোটি ২০ লাখ ডলার দিতে হবে।
ওএফএসির মতে, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত আদানি এন্টারপ্রাইজেস দুবাইভিত্তিক এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এলপিজি কিনেছিল। ওই ব্যবসায়ী ওমানি ও ইরাকি গ্যাস সরবরাহ করছে বলে দাবি করেছিল। ওএফএসি এক বিবৃতিতে বলেছে, কিছু সতর্কবার্তা বা ইঙ্গিত ছিল, যা থেকে আদানি এন্টারপ্রাইজেসের বোঝা উচিত ছিল, ওই এলপিজি আসলে ইরান থেকে এসেছিল।
ওএফএসি বলেছে, ওই সময়ের মধ্যে আদানি এন্টারপ্রাইজেস ওই চালান বাবদ মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ৩২টি কিস্তি পরিশোধ করেছিল, যার মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯ কোটি ২১ লাখ ৪ হাজার ৪৪ ডলার।
ওএফএসি আরও বলেছে, জরিমানার এই পরিমাণ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ওএফএসির বিবেচনা ছিল, আদানির এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন ছিল অত্যন্ত গুরুতর এবং তারা নিজেরা এটি স্বেচ্ছায় প্রকাশ করেনি। তবে আচরণটি ধরা পড়ার পর আদানি এন্টারপ্রাইজেস যে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ওএফএসির তদন্তে যে সহযোগিতা করেছে—সে জন্য জরিমানার পরিমাণ কমানো হয়েছে।
২০২৩ সালের জুনে আদানি এন্টারপ্রাইজেস এলপিজি আমদানি করে ভারতের গ্রাহকদের কাছে বিক্রির মাধ্যমে এলপিজি বাজারে প্রবেশ করে। তবে এর আগে আদানি এন্টারপ্রাইজেস বা তাদের কোনো সহযোগী প্রতিষ্ঠান মুন্দ্রা বন্দরের মাধ্যমে নিজস্ব উদ্যোগে এলপিজি ব্যবসা করেনি।
ওএফএসি জানিয়েছে, এই ব্যবসায়িক সম্পর্কের শুরুর দিনগুলো থেকেই বেশ কিছু সতর্কবার্তা দুবাইয়ের ওই সরবরাহকারীর জ্বালানির আসল উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। ওএফএসির মতে, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে অন্তত চারটি ভিন্ন সময়ে আদানি এন্টারপ্রাইজেস তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে জানতে পেরেছিল, দুবাইয়ের সরবরাহকারীর পাঠানো জ্বালানি ইরান থেকে এসে থাকতে পারে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংযোগের সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও আদানি এন্টারপ্রাইজেস অসতর্কভাবে কাজ করেছে এবং এই স্পষ্ট লঙ্ঘনের বিষয়টি তাদের জানার কারণ ছিল। এর মধ্যে রয়েছে তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে পাওয়া সতর্কবার্তা। এতে ইঙ্গিত ছিল, আদানি এন্টারপ্রাইজেসের আমদানি করা এলপিজি ইরানের হতে পারে। এই জ্বালানির উৎস ও মূল্যের বিষয়টি অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক্যালি অসম্ভব বা অবিশ্বাস্য ছিল।
ওএফএসি বলেছে, আদানি এন্টারপ্রাইজেস ওএফএসিকে ব্যাপক সহযোগিতা করেছে। যার মধ্যে রয়েছে দ্রুততম সময়ে এবং বিপুল খরচ করে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ, স্বাধীন অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনা, ওএফএসির তথ্যের অনুরোধে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং এই স্পষ্ট লঙ্ঘনসংক্রান্ত বিশাল তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করা।
ওএফএসি আরও বলেছে, এই স্পষ্ট লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়ায় আদানি এন্টারপ্রাইজেস উল্লেখযোগ্য সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে ভারতে এলপিজি আমদানি বন্ধ করা, তাদের নিষেধাজ্ঞা পরিপালন নীতি ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা।