প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়র মোড়কের সামনের দিকে সতর্কীকরণ লেবেল দেওয়ার প্রস্তাব করেছে ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (এফএসএসএআই)। খাবারে অতিরিক্ত চিনি, চর্বি বা লবণ থাকলে তা লেবেলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার এই উদ্যোগের বিষয়ে সংস্থাটির এত দিন আপত্তি ছিল। তবে এ নিয়ে জনরোষ বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন করে সতর্কীকরণ লেবেল চালুর প্রস্তাব দিয়েছে এফএসএসএআই।
ভারতের ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি (প্রায় ১২ লাখ ৩৩ কোটি টাকা) খাদ্যবাজারে এ সিদ্ধান্ত খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বড় ধাক্কা। কোকাকোলা, নেসলে ও পেপসিকোর প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পগোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের লেবেলের বিরোধিতা করে আসছে।
তাদের যুক্তি হচ্ছে, এসব লেবেল ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করে। অন্যদিকে স্থূলতার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী ও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বারবার এ ধরনের লেবেল চালুর আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
এফএসএসএআই গতকাল শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া এক আবেদনে খাবারের প্যাকেটের সামনের দিকে ‘লাল’ রঙের ষড়্ভুজ আকৃতির সতর্কীকরণ চিহ্ন দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। কোনো খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, চিনি বা লবণের মধ্যে অন্তত দুটি উপাদানের পরিমাণ বেশি হলে এই চিহ্ন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার কয়েক বছর ধরে কোনো না কোনো ধরনের সতর্কীকরণ লেবেল চালুর চেষ্টা করে আসছে। তবে চলতি বছর খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর গোপন (প্রাইভেট) আপত্তির কারণে একটি প্রস্তাব বাতিল করা হয়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে এমনটি বলা হয়েছিল।
ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোক্তা ও স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কারণ, কোকাকোলা ও নেসলের মতো প্রতিষ্ঠান ইউরোপের অনেক বাজারে কয়েক বছর ধরে স্বেচ্ছায় এ ধরনের লেবেল ব্যবহার করে আসছে।
গতকালের আবেদনে এফএসএসএআই বলেছে, সতর্কীকরণ লেবেলে ‘উচ্চ চর্বি’, ‘উচ্চ চিনি’, ‘উচ্চ লবণ’ এবং অথবা ‘অত্যধিক মিষ্টিযুক্ত পানীয়’র মতো ঘোষণা থাকবে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান বেশি থাকা পণ্যগুলো ভোক্তারা সহজেই শনাক্ত করতে পারবেন।
এফএসএসএআই আরও বলেছে, এই ব্যবস্থা বিশেষ করে শিশু ও জনগোষ্ঠীর অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ অংশের মানুষকে সচেতনভাবে খাবার বেছে নিতে সহায়তা করবে।
সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া এ আবেদনটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে এর একটি অনুলিপি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাংবাদিকদের হাতে এসেছে।
ভারতের স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্কীকরণ লেবেল চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের করা আবেদনের শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট চলতি মাসের শুরুতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বলেছিলেন। রয়টার্সই প্রথম এই আবেদনের খবর প্রকাশ করেছিল।
বর্তমানে ভারতে খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্যাকেটের পেছনে শুধু উপাদান ও খাবারের মৌলিক পুষ্টিগুণের তথ্য উল্লেখ করতে হয়।
সতর্কীকরণ লেবেলের ঘাটতি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা অলাভজনক সংগঠন ‘থ্রি-এস অ্যান্ড আওয়ার হেলথ’-এর প্রধান আইনজীবী রাজীব শঙ্কর দ্বিবেদী বলেন, তাঁরা সরকারের প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন। তাঁদের বিশেষজ্ঞরাও প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করবেন।
অবস্থান পরিবর্তন
রয়টার্সের এ সপ্তাহের প্রতিবেদনে প্রকাশিত বৈঠকের তথ্যমতে, গত মার্চে উত্তেজনাপূর্ণ এক বৈঠকে খাদ্যশিল্পের নির্বাহীরা যুক্তি দিয়েছিলেন, এ ধরনের সতর্কীকরণ লেবেল বিভ্রান্তিকর ও অকার্যকর। তাঁরা খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে ভোক্তাদের উৎসাহ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
গত ১৯ মার্চের ওই বৈঠকে কোকাকোলা ইন্ডিয়ার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী মিলি ভট্টাচার্য বলেন, কোনো ভোক্তা যদি আগে থেকে খাবারের উপাদানের তালিকা না পড়েন, তাহলে প্যাকেটে কোনো প্রতীক বা চিহ্ন দেখে তাঁর খাদ্যাভ্যাস উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে—এমনটা ভাবা ‘খুবই সরল’ ধারণা।
মিলি ভট্টাচার্য আরও বলেন, সতর্কীকরণ লেবেল অর্থহীন। কারণ, এসব লেবেল ভোক্তাদের চিনি ও লবণযুক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারবে না। ভারতীয় চিকিৎসকেরা তাঁদের রোগীদের কোন খাবার এড়িয়ে চলতে হবে, তা বোঝানোর ক্ষেত্রে ভালো কাজ করেছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আগস্টে এফএসএসএআই সুপ্রিম কোর্টকে জানায়, প্যাকেটের গায়ে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ লেবেল চালু করা ‘কঠিন’। এ বক্তব্যে খাদ্যশিল্পের অবস্থানের প্রতিফলন ঘটে।
এর আগে আদালত বলেছিলেন, ভারত ইসরায়েলের মতো লেবেল ব্যবস্থা বিবেচনা করতে পারে। সেখানে কোনো পণ্যে লবণ, চিনি বা চর্বির যেকোনো একটির পরিমাণ বেশি হলেও লাল রঙের সতর্কীকরণ লেবেল দেওয়া হয়।
চলতি মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে ভর্ৎসনা করেন। আদালত বলেছেন, ‘বিশ্বের জানা উচিত, ভারত তার নাগরিকদের সার্বিক স্বাস্থ্য নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।’ এ সময় ভারতে স্থূলতার উচ্চ হার নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়।
তবে গতকালের আবেদনে দেখা গেছে, ভারতের প্রস্তাবে কোনো পণ্যে লবণ, চিনি বা চর্বির মতো পুষ্টি উপাদানের মধ্যে কেবল দুটির পরিমাণ বেশি থাকলে লাল রঙের সতর্কীকরণ লেবেল দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে প্রায় ৪৫ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার সমস্যায় ভুগতে পারেন।
গতকালের আবেদনে এফএসএসএআই বলেছে, খাদ্যশিল্পকে প্রস্তুতির জন্য সময় দিতে ধাপে ধাপে এই লেবেল ব্যবস্থা চালু করা হবে। একটি মাত্র উপাদান দিয়ে তৈরি খাবার এ ব্যবস্থার আওতামুক্ত থাকবে।